নাগরিক কথা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বনাম নতুন গজানো “বোদ্ধাসমাজ”!

আমি জানিনা আমাদের দেশটাই একমাত্র দেশ কিনা যেখানে চলচ্চিত্রের প্রোডাকশন ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস ফাইভে পড়ে কিন্তু সমালোচক ইন্ডাস্ট্রি পিএইচডি করে বসে আছে! আমি বলছি না যে খারাপকে খারাপ বলা যাবেনা। কিন্তু কিছু ব্যাপার-স্যাপার অন্তত শিক্ষিত মানুষের বোঝা উচিত।

খুব স্পষ্টভাবে সবার জানা আছে যে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ভালো না। কালেভদ্রে হয়তো দুই একটা ভালো মুভি হয় যেগুলোর হলে দর্শক টানার ক্ষমতা আছে। বাকী মুভিগুলি অখাদ্য।

এইরকম একটা সিনেমা বের হলে মানুষের উচিত দলবেঁধে হলে যাওয়া, অন্যকে উৎসাহ দেয়া হলে যাওয়ার জন্য। মুভিটা যখন ব্যবসা করতে পারবে তখন আরও দুইজন প্রযোজক সাহস পাবে এইরকম মুভি করার। সিনেমা বানানো অনেক কষ্টসাধ্য, খরুচে একটা ব্যাপার। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় সমস্যা হচ্ছে টাকা দিলেই ভালো সিনেমা হয়না; প্যাশন, মেধা, পরিশ্রম, ভিশন, স্যাক্রিফাইস ছাড়া একটা ভালো সিনেমা হয়না। দশটা সিনেমা বছরে ব্যাবসাসফল হলে মেধাবী লোকজন এইদিকে যেতে চাইবে। কারণ দিনশেষে পকেটে টাকাটা একটা ফ্যাক্টর। জীবন চালাতে জীবিকার প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের দর্শকদের মোটামুটি ৩ টা ক্লাসে ভাগ করা যায়। “ক্যুল ড্যুড” দর্শক যাদের বিনোদন শুধুমাত্র বিদেশী মুভি, গানে সীমাবদ্ধ। গ্রাম মফঃস্বলের সাধারণ মানুষেরা, যারা সাকিব খান-অপু বিশ্বাসের সিনেমার বিরাট ভক্ত এবং এরাই এতদিন আমাদের ভাঙ্গাচোরা ইন্ডাস্ট্রিটা টিকিয়ে রেখেছে। বাকী আছে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি। এরা অনেক বছর আগেই সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মনপুরা, চোরাবালি, জালালের গল্প, টেলিভিশন, আয়নাবাজি, অজ্ঞাতনামা, কমন জেন্ডার, ছুঁয়ে দিলে মন, অনন্ত জলিলের সিনেমা, হুমায়ুন আহমেদের সিনেমাগুলি এই মধ্যবিত্ত দর্শক শ্রেণীটাকে অনেক বছর পরে হলে ফিরিয়ে নিচ্ছে। এভাবে দর্শক বাড়তে থাকলে আস্তে আস্তে ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে যাবে।

খুব বিরক্তি নিয়ে লক্ষ্য করি যে হলে দর্শক টানার মত সিনেমাগুলি রিলিজ হওয়ার পরে একশ্রেণীর পণ্ডিত সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষকে ডিমোটিভেট করার কাজে নেমে পড়ে। তারা বের করে এই সিনেমা বিদেশী অমুক সিনেমার নকল।
আয়নাবাজি নাকি টাম্বেলউডের নকল। কিন্তু সিনেমা দুইটা তারা দেখেই নাই ৯৫% সম্ভাবনা।
গল্পের ফাঁক বের করবে। কোন সিকুয়েন্সে কি সমস্যা এগুলির এনালাইসিস বের করবে। জীবনে একটা ক্যামেরা হাতে না নেয়া লোকও সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে তত্ত্ব বের করবে। সিনেমার কাহিনী বাস্তব নাকি অবাস্তব এই প্রশ্ন ছুড়ে দেবে। এমনকি গঠনমূলক সমালোচনার পথে না হেঁটে একটা সিনেমাকে পচানোটা নিজের প্রেস্টিজ ইস্যু-ও বানিয়ে ফেলে বেশ ক’জন!

ভাই হলে যান, সিনেমাটা দেখেন। ভালো না লাগলে এমনভাবে ভালো লাগেনাই বলেন যাতে অন্য কারো হলে যাওয়ার ইচ্ছা নষ্ট না হয়। আপনারাই বছরের পর বছর ফিজিক্সের সূত্র ভেঙ্গে দেয়া তামিল সিনেমার অ্যাকশন দেখেন, বন্ধুবান্ধবকে দেখান, অবাস্তব কাহিনীর সুপারম্যানের টিশার্টও পড়ে ঘোরেন। শুধুমাত্র বাংলাদেশের সিনেমার ব্যাপারেই কেন আপনার এত কিছু আশা করতে হবে? ভাঙ্গাচোরা ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনেক কষ্ট করে একটা সিনেমা যখন বের হয়, হলে আসে, শুধুমাত্র সেই সিনেমাটাকেই কেন বাস্তবধর্মী হতে হবে, শিক্ষণীয় হতে হবে, একদম অরিজিনাল কাহিনী হতে হবে, প্রচুর সংস্কৃতি মেনে চলতে হবে, একদম বাস্তব একশনধর্মী হতে হবে, প্রতিটা সিকোয়েন্স পারফেক্ট হতে হবে? আপনি যখন পাবলিকলি এইসব করে বেড়াচ্ছেন, তখন যে আস্তে আস্তে করে একজন একজন দর্শক কমছে সিনেমাটার, এবং সেই সাথে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের- সেইটা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?

নতুন মাইক আসছে সবাই কেন আয়নাবাজি নিয়ে লাফাচ্ছে, কেন একই সময়ে আসা অজ্ঞাতনামা নিয়ে লাফাচ্ছে না? মার্কেটিং বলতে যে একটা ব্যাপার আছে সেইটা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। নাকি জানেন না? আয়নাবাজি যখন চমৎকার মার্কেটিং করে হাইপ তৈরী করতে পেরেছে, অজ্ঞাতনামা পারেনাই। হয়তো বাজেটেরই অভাব। আপনি করেন না একটু মার্কেটিং। ফেসবুকে একটা পোস্ট দেননা এই সিনেমটা নিয়ে, বন্ধু বান্ধবকে নিয়ে হলে যান! কে না করেছে আপনাকে? অজ্ঞাতনামা ভালো লাগলে প্লিজ তাদেরকে মার্কেটিং-এ হেল্প করেন। দুইটা সিনেমার হলেই মানুষ যাক। দুইটাই ব্যবসা করুক। সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে উঠুক।

হঠাত করে আজগুবী অ্যাকশন, ভিনগ্রহের লজিকে বানানো কাহিনীভিত্তিক কিছু সিনেমা নিয়ে তেলেগু সিনেমাগুলি এত ব্লকবাসটার হিট করে কারণ তাদের ওইখানে আপনার মত লোক নাই যারা নিজেরা টয়লেটে ফ্লাশ না করে বাকিদেরকে বলে বেড়ায় ওইখানে গন্ধ। যেই উচ্চমার্গীয় সমালোচনাগুলি করে মানুষজনকে হল থেকে দুরে নিয়ে যাচ্ছেন জাস্ট নিজের পন্ডিতী জাহির করার জন্য, সেটার সময় এখনও আসেনি। ইন্ডাস্ট্রিটাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেন, তারপরে এইসব সমালোচনা করেন। তখন সিনেমাগুলি ভালো হবে আরও। এর আগ পর্যন্ত খালি হলে যান। সবাইকে নিয়ে যান। এভাবে ইন্ডাস্ট্রিতে কুড়াল মারবেন না। যদি ভাবেন খালি নাই-নাই বলতে থাকলে জাতে উঠা যায়, তাহলে অনেক বড় ভুল করছেন।

* কভার ইমেজটি আয়নাবাজি’র ফেসবুক পেজ হতে সংগৃহিত।

Most Popular

To Top