শিল্প ও সংস্কৃতি

২০১৬ – হেভিমেটাল অ্যালবামের বছর (১ম পর্ব)

neon aloy নিয়ন আলোয়

যদি ব্ল্যাক সাব্বাথের প্রতিষ্ঠার বছর, মানে ১৯৬৮ সালকে হেভিমেটালের জন্মের বছর হিসেবে ধরা হয়, তাহলে হেভিমেটালের বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি এখন। এই পঞ্চাশ বছরে হেভিমেটাল জনরাকে কিন্তু অনেক পরিবর্তন, হুমকি, সফলতা এবং বাজে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। অসাধারণ কিছু ব্যান্ড এসেছে, অসাধারণ  কিছু নতুন সাব জনরার হুঙ্কার আমরা শুনেছি, লাইভ পারফরম্যান্সে এসেছে নতুনত্ব এবং পেশাদারিত্ব, এরই সাথে মেটালহেডদের চরম রোষানলে পরে গ্ল্যামমেটাল, হেয়ার মেটালের মত অনেক সাব জনরাকে আমরা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যেতে দেখেছি। অদ্ভুতভাবে প্রগ্রেসিভ মেটালের নীরব অভ্যুত্থান দেখেছি, যেখানে ড্রিমথিয়েটার এর মত ব্যান্ডকে সার্বজনীন হবার জন্য এমটিভি’তে তিন মিনিটের ভিডিও বানাতে হয়েছে। আর প্রগ্রেসিভ মেটালের সবচাইতে পরিমার্জিত সাব জনরা জেন্ট (djent) এর প্রায় প্রতিটা মিউজিসিয়ানের আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয় হতে দেখেছি। অবশ্য এখানে জেন্ট মিউজিসিয়ানদের লিসেনার-ফ্রেন্ডলি আচরণও অনেক প্রাধান্য পেয়েছে। এরই সাথে চোখে পড়েছে টেকনিক্যাল ডেথ ও সিম্ফনিক মেটালের আগ্রাসন। শুরুর দিককার সাউন্ড এর সাথে ইদানিং কালের ব্যান্ডগুলোর কম্পোজিশন এবং সাউন্ডে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও হেভিমেটাল তার নিজস্বতা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছে তা হয়তো মেটালহেডরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে এই জনরার সকল নতুন সাব জনরার জনপ্রিয়তা এবং গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না।

হেভিমেটালের জন্মের পর প্রায় প্রতিটা দশকই ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ৮০’র দশকের পুরোটা জুড়েই ছিল বিগ ফোর এর রাজত্ব, ৯০’র দশকে প্রগ্রেসিভ মেটাল তার নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে প্রতিটা মেটালহেডদের মনে আর ২০০০ এর দশকের এর প্রথমার্ধে মেটাল কোরের জনপ্রয়তাও ছিল চোখে পরার মত। কিন্তু জন্মের ৪৮ বছর পর ২০১৬ সালটাও ছিল হেভিমেটালের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। কারন এই বছর রিলিজড হয়েছে হেভিমেটাল জনরার নতুন এবং পুরাতন প্রথম সারির কিছু ব্যান্ডের অ্যালবাম এবং বেশ কিছু ইপি (Extended Play) অ্যালবাম। এছাড়াও মুক্তির অপেক্ষায় আছে আরও কিছু ব্যান্ডের অ্যালবাম। আজকে আমরা সেই সকল ব্যান্ড এবং তাদের প্রকাশিত/ মুক্তির অপেক্ষায় থাকা অ্যালবাম ও কিছু আলোচিত ইভেন্টস নিয়েই আলোচনা করবো। যেহেতু প্রকাশিত অ্যালবামের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই মেটালহেডদের সুবিধার্থে সবচেয়ে আলোচিত অ্যালবামগুলো পর্ব আকারে আলোচনা করা হলো। যাদের এখনো অ্যালবামগুলো শোনা হয়নি, তারা অবশ্যই লিগাল সাইট অথবা ব্যান্ডের অফিসিয়াল পেজ  থেকে গানগুলো শুনবেন।

 

১। ব্ল্যাক সাব্বাথ (দি এন্ড ইপি)

neon aloy নিয়ন আলোয়

২০১৬ এর শুরুর দিকে এই লেজেন্ডারি ব্যান্ডের ইপি বের হয়েছে, যা তাদের লাস্ট অ্যালবাম “থার্টিন” এর কিছু অপ্রকাশিত গান দিয়েই সাজানো। ব্যান্ডের নিয়মিত সদস্য অজি ,টনি, গিজার বাটলার ছাড়াও এই ইপিতে কাজ করেছেন অডিওস্লেভ ও রেজ এগেন্সট দ্যা মেশিন খ্যাত ড্রামার ব্রাড উইক, অজি অসবোর্ন ব্যান্ডের ড্রামার টমি ক্লুফেটস এবং কিবোর্ডিস্ট এডাম ওয়েকমান। বছরটি ব্ল্যাক সাব্বাথ এবং সব মেটাল ভক্তদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারন এপ্রিলের দিকে তারা ‘দ্যা ফাইনাল’ ট্যুরের ঘোষণা দিয়েছেএবং ট্যুর গুলোতে তারা দ্যা এন্ড ইপি’র প্রায় সবগুলো গানই পারফর্ম করেছে। ৮টি গান দিয়ে সাজানো সর্বমোট ৫৪ মিনিটের এই ইপিতে ব্ল্যাক সাব্বাথ এর নিজস্বতা ছিল লক্ষণীয়।

 

২। মেগাডেথ (ডিস্টোপিয়া)

neon aloy নিয়ন আলোয়

থ্রাশ মেটাল ব্যান্ড মেগাডেথ এর জন্যে এই বছরটা অনেক ইভেন্টফুল ছিল, পঞ্চদশ স্টুডিও অ্যালবামের রেকর্ডিং এর কাজ শুরু হবার সময় তাদের অনেকদিনের গিটারিস্ট ক্রিস ব্রডেরিক এবং ড্রামার শন ড্রোভার ব্যান্ড ছেড়ে চলে যায়। তাদের পরিবর্তে ব্যান্ডে কাজ করে হেভিমেটালের অনেক পরিচিত নাম এবং সবার পছন্দ ল্যাম্ব অফ গডের ড্রামার ক্রিস অ্যাডলার এবং ব্রাজিলিয়ান ব্যান্ড আংরা’র গিটারিস্ট কিকো লরেইরো। ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এ অ্যালবামের লিরিকাল থিমে ব্যান্ডের সিগনেচার টপিকগুলো লক্ষ্য করা গেছে। রেডিও ওরিয়েন্টেড সাউন্ড থেকে বের হয়ে থ্রাশ ওরিয়েন্টেড সাউন্ডের আধিক্য ছিলো লক্ষ্যণীয়! এবং ক্রিস অ্যাডলারের গ্রুভি ড্রামিং হয়ত সবারই ভাল লেগেছে। কিন্তু এ বছরের মে মাসে মেগাডেথের অনেক কালজয়ী গানের ড্রামার নিল মেনযা’র মৃত্যু ব্যথিত করেছে আমাদের সবাইকেই।

 

৩। ড্রিম থিয়েটার (দ্যা আস্টোনিশিং)

neon aloy নিয়ন আলোয়

প্রগ্রেসিভ রককে সবার কাছে জনপ্রিয় করেছে যে ব্যান্ড, সেই ড্রিম থিয়েটার এই বছরের জানুয়ারির ২৯ তারিখে তাদের ত্রয়োদশ স্টুডিও অ্যালবাম বের করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্যান্ডের গিটারিস্ট জন পেট্রুচি এই অ্যালবামের থিমের ক্ষেত্রে সবার প্রিয় টিভি সিরিয়াল গেইম অফ থ্রোন্স এবং জনপ্রিয় সাই ফাই মুভি স্টার ওয়ার্স থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ব্যান্ডের সাবেক ড্রামার মাইক পোর্টনয়কে যারা মিস করছিলেন, তারা হয়তো এই এ্যালবামে মাইক ম্যানজিনি’তে  কিছুটা স্বস্তি পাবেন। দুই অ্যাক্টে বিভক্ত এই এ্যালবামের প্রথম অংশ প্রায় ৮০ মিনিটের এবং দ্বিতীয় অংশ প্রায় ৫০ মিনিটের।

 

৪। অ্যান্থ্রাক্স (ফর অল কিংস)

neon aloy নিয়ন আলোয়

আগেই বলেছিলাম ২০১৬ সাল মেটালহেডদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ এই বছর জনপ্রিয় অনেক ব্যান্ডের সাথে প্রকাশিত হবে দ্যা বিগ ফোরের প্রায় প্রতিটি ব্যান্ডেরই অ্যালবাম। ফ্রেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই তা শুরু করেছিল অ্যানথ্রাক্স ব্যান্ড তাদের একাদশ অ্যালবাম রিলিজের মাধ্যমে।অ্যানথ্রাক্স-এ অনেক দিন বাজানোর পর ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট রব কাগিয়ানো এই অ্যালবামের কাজ শুরু করার আগেই ভলবিট ব্যান্ডে জয়েন করে, যার ফলে অ্যানথ্রাক্স-ভক্তরা নতুন গিটারিস্ট জন ডোনাইস এর প্লেয়িং শোনার সুযোগ পায়। আমার মনে হয় না কেউ তাতে নিরাশ হয়েছে। এই অ্যালবামের টাইটেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন  সদস্য এবং গিটারিস্ট স্কট ইয়ান বলেছে, “এই অ্যালবামটার আমরা এই নাম দিয়েছি কারণ আমি মনে করি যে কেউ রাজা হতে পারে। বড় হওয়ার সাথে সাথে, দায়িত্বশীল হওয়ার সাথে সাথেই একটা মানুষ নিজের জীবন এবং নিজের নিয়তির নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর মানে এই না যে এই রাজা হওয়ার মানে আশেপাশের মানুষগুলোর উপর বসগিরি ফলানো, বরং নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের মনোমতো চলার স্বাধীনতা পাওয়া। নিজের জীবনের লাগাম এবং কাজের ভার নিজের হাতে তুলে নেওয়াটাই আমার কাছে একজন মানুষের নিজের রাজত্ব”।

 

৫। অ্যামন আমার্থ (জমসভাইকিং)

neon aloy নিয়ন আলোয়

জনপ্রিয় সুইডিশ মেলোডিক ডেথ মেটাল ব্যান্ড অ্যামন আমার্থ তাদের প্রথম কন্সেপচুয়াল অ্যালবাম বের করেছে এই মার্চের ২৫ তারিখে। অনেকের মতে এই অ্যালবামটিতে ট্র্যাডিশনাল মেলোডিক মেটাল স্টাইল বেশি দেখা গিয়েছে বলে এই অ্যালবামটিকে তারা গতানুগতিক মেলোডিক ডেথ মেটাল আলবাম হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বাকিরা অ্যামন আমার্থ এর এই পরিবর্তন ভাল ভাবেই গ্রহন করেছে। ব্যান্ডের ভোকাল জোহান হেগ এই অ্যালবামের কনসেপ্ট বর্ণনা করতে গিয়ে ব্ল্যাবারমাউথ ম্যাগাজিনকে বলেছেন, “জমসভাইকিং এর কাহিনীটা আসলে একটা গল্পের পটভূমি, যেখানে এক যুবক যে মেয়েকে ভালবাসে, যার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যায়। সে অসাবধানতাবশত একজন মানুষকে মেরে ফেলে, যার জন্য সে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়। তবে সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো প্রতিশোধ নেওয়ার এবং মেয়েটিকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনার। সে অতীতকে ভুলে যেতে পারছিলো না। সে জানে সে ভুল করেছে, এবং এ ভুলের কারণে তার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আসলে ঘটনাটা যেভাবে ঘটে যায়, সেটার সমাপ্তি খুব একটা সুখকর না।”

এছাড়াও জার্মানির জনপ্রিয় ব্যান্ড এডগাই এর ভোকাল টবিয়াস সাম্মেট এর বানানো সুপার রক অপেরা গ্রুপ এভান্তাসিয়ার সপ্তম স্টুডিও অ্যালবাম ঘোস্টলাইটস। আমেরিকান ডেথ মেটাল ব্যান্ড মাস্টার এর দ্বাদশ অ্যালবাম অ্যান ইপিফানি অফ হেট বের হয়েছে বছরের শুরুতেই। ফ্রেব্রুয়ারিতে আরও প্রকাশ পেয়েছে  হেভিমেটাল ব্যান্ড ড্রাউনিংপুলের ষষ্ঠ অ্যালবাম, জার্মান ডেথ মেটাল ব্যান্ড অবস্কুরা’র চতুর্থ অ্যালবাম, ডাচ হেভিমেটাল ব্যান্ড টেক্সচার্স এর পঞ্চম ও ফিনল্যান্ডের পরিচিত মেলোডিক ডেথ মেটাল ব্যান্ড ওমনিয়াম গ্যাদারাম এর গ্রে হেভেন্স অ্যালবামটি।

neon aloy নিয়ন আলোয়

মার্চে রিলিজ হওয়া নতুন জেন্ট ব্যান্ড হ্যাক্টিভিস্ট এর প্রথম অ্যালবাম আউট সাইড দ্যা বক্স এর কথা আলাদা করে বলতেই হবে। কিলসুইচ এঙ্গেজ তাদের ইনকারনেট অ্যালবামও এই মাসেই বের করে। নরওয়ে’র প্রগ্রেসিভ মেটাল ব্যান্ড সারকাস মাক্সিমাস এর চতুর্থ অ্যালবাম হ্যাভক প্রকাশিত হয় মার্চে।

neon aloy নিয়ন আলোয়

আগামী পর্বে এই বছর বের হওয়া বাকী অ্যালবামগুলো নিয়ে আলোচনা করব। মেটালহেডদের বলছি আপনাদের পছন্দের এই বছরের অ্যালবামগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আর লেখকের মতামতের সাথে অনেকে দ্বিমতও পোষণ করতে পারেন। তবে মেটালহেড ব্রাদারহুডের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এর পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলা কাম্য। (চলবে)

Most Popular

To Top