নাগরিক কথা

জনতার আদালতে মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী, নাকি উল্টোটা?

মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী নিয়ন আলোয় neon aloy

১৪ মাস পর টেস্টে ক্যাপ্টেন্সী করতে নামা মুশফিকুর রহিমের প্রত্যেকটা ডিসিশন নিয়ে পাবলিক রিএকশনগুলা দেখে যারপরনাই বিরক্ত হচ্ছি। হ্যাঁ, মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী, পরিষ্কার করে বলতে গেলে ডিফেন্সিভ এবং “মুখস্থ” ক্যাপ্টেন্সী’র জন্য এর আগে বেশ কয়েকটা ম্যাচে বাংলাদেশকে ভুগতে হয়েছে- কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু চলমান বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড প্রথম টেস্টেও কি ব্যাপারটা এরকম? ব্যাক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে কিভাবে দেখছি মুশফিকের ডিসিশনগুলো, সেটা নিয়েই এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা।

 

টপিক ১ঃ “২১ রানে ৩ উইকেট পরার পর মুশফিক কেন সাকিবের বোলিং কন্টিনিউ না করিয়ে পেসারদের হাতে বল দিলো? নিশ্চয়ই মুশি মুখস্থ ক্যাপ্টেন্সি করছে!”

– মুশফিক যদি মুখস্থ ক্যাপ্টেন্সী-ই করতো, তাহলে শুরুতেই নতুন বলে স্পিনার আনতো না। ১০-১২ ওভার শফিউল আর রাব্বিকে দিয়ে বোলিং করিয়ে তারপর স্পিনার আনতো অ্যাটাকে, আর ততক্ষণে হয়তো পেস বোলিং-এ খেলতে সাবলীল অ্যালিস্টার কুক সেটল হয়ে যেতো ক্রিজে। আমার যদ্দুর ধারণা, স্পিনে টপাটপ ৩ উইকেট হারিয়ে ইংলিশরা ডিফেন্সিভ মোডে চলে গেছিলো দেখেই পেসার নিয়ে এসেছিলো মুশফিক, যেন ব্যাটসম্যানরা ফ্রি হয়ে খেলতে গিয়ে ভুল করে। যদিও কাজে দেয় নাই এই ট্রিক, যেমনটা কাজে দিয়েছে শুরুতেই স্পিনার আনার কৌশলটা। এখন ট্রিক কাজে লাগেনাই বলে মুশফিকের মুন্ডুপাত হচ্ছে। কিন্তু চিন্তা করে দেখেন, শুরুতে স্পিন আনার ট্রিকটা যদি কাজে না লাগতো, তাইলে কিন্তু আমরাই মুশফিককে গালি দিতাম আবার!

টপিক ২ঃ “মিরাজের মত বাচ্চা পোলাটারে দিয়া এত ওভার বল করাইলো কেন?! মুশফিক কি মানুষ??”

– দেখেন ভাই, টিম সিলেকশন আর স্কোয়াড নিয়ে ফেসবুকের ক্রিকেটভিত্তিক গ্রুপগুলোতে প্রচুর বাকবিতণ্ডা চলছে ওয়ানডে সিরিজ শেষ হওয়ার পর থেকেই। গ্রুপে অনেকেই মিরাজকে অভিষেক করানোর সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলো। আর এখন যখন ছেলেটা প্রায় একাই ইংল্যান্ডকে ধসিয়ে দিয়েছে, তখন সবাই তাকে দিয়ে বেশি ওভার করানোতে মুশফিকের দোষ খোঁজা শুরু করেছে!
যাই হোক, একজনকে লিখতে দেখলাম এভাবে ওভার-স্ট্রেস করলে মিরাজও মাশরাফির মত ইনজুরিপ্রবণ হয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন। আরে ভাই, পেসার আর স্পিনারের ফিজিক্যাল স্ট্রেস এক পাল্লায় মিলালেন কিভাবে?! আর ম্যাচশেষে মিরাজকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো এতগুলা ওভার করে সে ক্লান্ত কিনা? তার সাবলীল জবাব ছিলো সে ন্যাশনাল লীগে লম্বা স্পেল করে অভ্যস্ত, তাই গতকালকে ৩০+ ওভার বোলিং করাটা তার কাছে তেমন কষ্টকর মনে হয় নাই। আর এরকম এনার্জেটিক আর উইকেট-টেকিং বোলার পেলে, যে কিনা উইকেটের সুবিধা পুরোপুরি উসুল করে নিতে পারছে, অধিনায়ক কাজে লাগাবে না কেন? আশ্চর্যজনকভাবে এইটাকেও মানুষ মুশি’র অ্যাটাকিং ইনটেন্ট হিসাবে না ধরে তার “মুখস্থ” ক্যাপ্টেন্সি’র উদাহরণ হিসাবে ধরতেসে! অথচ নিয়মিত উইকেট তুলে নেওয়া মিরাজকে কম ওভার করালে সেটাকে বরং মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী হিসাবে ধরা যেতো।

টপিক ৩ (এতই বিরক্তিকর যে এটাকে ইস্যু হিসাবে ধরতেও বিরক্ত লাগছে)ঃ “বামহাতি ইমরুল আউটগোইং স্পিনে আউট হওয়ার পরেও ডানহাতি কাউকে না নামিয়ে বামহাতি মমিনুলকে কেন ব্যাটিং-এ পাঠালো মুশফিক? মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী আর কত সহ্য করবো খোদা?”

-যিনি এই অভিযোগ এনেছিলেন, তার ক্রিকেটজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন না তুলে এরকম কথার কি জবাব হতে পারে আমার জানা নাই। টেস্টে মমিনুলের চেয়ে ভাল ওয়ান-ডাউন ব্যাটসম্যান বাংলাদেশে এখন কেউ আছেন কিনা আমার জানা নাই। এখন “বল ঘুরতেসে” – “অমুক লজিকে বামহাতি নামানো উচিৎ হয়নাই” – “তমুক যুক্তিতে ডানহাতি নামানো ঠিক হয়নাই” হিসাব করলে মাঠে না নেমেই ইনিংস ডিক্লেয়ার করা লাগেরে ভাই! আর তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই মুশফিকও এই উদ্ভট লজিকে মাথা ঘামিয়ে মমিনুলের আগে ডানহাতি মাহমুদুল্লাহকে নামিয়েছে, তখন কিন্তু মুশি-মাহমুদুল্লাহ দুইজনেরই পিঠের চামড়া উঠে যেতো ভায়রা-ভাই কোটার খোঁটা শুনে।

 

সব মিলিয়ে আমার যা মনে হচ্ছে, মুশফিক যতটা না “মুখস্থ” ক্যাপ্টেন্সি করছে, তার চেয়ে বেশি মুখস্থ সমালোচনা করছি আমরা। মাথার মধ্যে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে “মুশফিকের ক্যাপ্টেন্সি খারাপ”, এই চিন্তা থেকেই একের পর এক ভুল জাজমেন্ট দিয়ে যাচ্ছি আমরা সমর্থকরা। তবে টেস্টের দ্বিতীয় দিনশেষে এখন পর্যন্ত মুশি’র ডিসিশনে বেশ ভালো পজিশনেই আছে বাংলাদেশ। সমর্থকদের কাছে অনুরোধ থাকবে- “হুদাই কাপঝাপ লাগায়েন নারে ভাই, keep calm and believe in pocket rocket”.

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড প্রথম টেস্টঃ স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, নাকি নতুন স্বপ্নের হাতছানি? - নিয়ন আলোয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top