টেক

অটোফেজি: একটি গবেষনা ক্ষেত্রের জন্ম, এবং একটি নোবেল পুরষ্কার!

অটোফেজি নিয়ন আলোয় neon aloy

১৯৮৮ সাল। বাজারে আসে এইচপি ব্র‍্যান্ডের প্রথম সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর। আইরিশ রক ব্যান্ড ইউটু তাদের প্রথম গ্র‍্যামি পায়জসুয়া ট্রিএর জন্যে। পৃথিবীময় তখন সিউলে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকসের উত্তেজনা। তার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত রাশিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়টাতেই টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মধ্যবয়সী কোষ বিজ্ঞানী কাজ শুরু করেন একটি কোষ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে। যে বিষয়টিতে গবেষণার সূত্রপাত সেই ১৯৫০ এর দশকে!

বেলজিয়ান কোষ বিশেষজ্ঞ ক্রিসচিয়ানডে দুভে আবিষ্কার করেন লাইসোজোমের। তার আবিষ্কার থেকেই ১৯৫৫ সালে লাইসোজোম শব্দের উৎপত্তি।ডে দুভের আবিষ্কারের হাত ধরে ১৯৬৩ সালেঅটোফেজিশব্দের উৎপত্তি হয়। অটোফেজি হল সে কৌশল যার মাধ্যমে জীব কোষ আভ্যন্তরীণ পরিবেশের আবর্জনা পরিষ্কার করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভাবের সময় অপ্রয়োজনীয় উপাদান থেকে শক্তিও তৈরি হয়।ডে দুভের আবিষ্কারের পর কয়েক দশক পর্যন্ত খুব নগণ্য পরিমাণ কাজ হয় অটোফেজি নিয়ে। এর প্রধান কারণ অটোফেজি তখন কেবল কোষের আবর্জনা নিষ্কাশন পদ্ধতি হিসেবেই পরিচিত ছিল। এর কৌশল, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোন প্রকার মাথা ঘামাতে চেষ্টা করেনি কেউ।

অটোফেজি নিয়ে পরবর্তী গবেষণার কর্ণধার জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি। ওসুমি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৩ সালে রসায়নে ভর্তি হনকিন্তু পরবর্তীতে অনুপ্রাণবিজ্ঞান (Molecular Biology) বেছে নেন। ১৯৭৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রকাফেলার ইন্সটিটিউটে পাড়ি জমান যেখানে তার পরিচয় হয় ঈস্ট গবেষণার সাথে। ১৯৭৭ সালে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং ঈস্ট কোষের উপর বিশদ গবেষনার সিদ্ধান্ত নেন।

উচ্চমাধ্যমিক জীববিজ্ঞানের কথা মনে থাকলে ঈস্ট কোষ এমন নতুন কোন বিষয় নয়। ১৯৮৮ সালে ওসুমি ঈস্ট কোষে অটোফেজি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। তার কৌতুহলের জন্ম হয় অটোফেজি প্রক্রিয়া নিয়ে। তিনি গবেষনা শুরু করেন ঈস্ট মিউটেশনের মাধ্যমে। যার সুবাদে অটোফেজি প্রক্রিয়া স্পষ্ট ভাবে অবলোকনের সুযোগ তৈরি হয়। ওসুমি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি মাইক্রোস্কোপে পর্যবেক্ষণ করে এর কৌশল বর্ণনা করেন। তিনি পরবর্তীতে অটোফেজির নিয়ন্ত্রণকারী জিন গুলো আলাদা করতে সক্ষম হন। সর্বসাকূল্যে ১৫টি জিন পাওয়া যায় যারা সরাসরি অটোফেজির জন্য দায়ী। সেই সাথে ওসুমি প্রমান করেন অটোফেজি প্রক্রিয়া নিম্নতর ঈস্ট থেকে শুরু করে উন্নত প্রানী এমন কি মানুষের কোষেও একই ভাবে পরিচালিত হয়। জীব বিজ্ঞানে যখন কোন প্রক্রিয়া প্রজাতি ভেদে একই রুপে সংরক্ষিত হয় তখন তা জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য বলে গণ্য হয়। উক্ত তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে অটোফেজির গুরুত্ব রাতারাতি বদলে যায়। ওসুমির পরবর্তী গবেষনায় এটাও প্রমানিত হয় যে অটোফেজি শুধু আবর্জনা নিষ্কাশন করে না, বরং আবর্জনা থেকে ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করে পূনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল অটোফেজি প্রক্রিয়ায় কোষ জীবাণু ধ্বংস করে, যার উপর দেহের প্রতিরক্ষা অনেকখানি নির্ভরশীল।

ওসুমির গবেষনার ফলশ্রুতিতে অটোফেজি নিয়ে গবেষনার দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী গবেষকগণ অটোফেজি প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাতের সাথে পারকিন্সন্স, আ্যলজাইমারস, ক্যান্সারের মত রোগের সূত্রপাত জড়িত তা প্রমান করেন। ওসুমির মূল্যবান গবেষনা ছাড়া এই দূরারোগ্য ব্যাধিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের এখনও হয়ত অজানা থেকে যেত। তিনি অটোফেজি গবেষনা ক্ষেত্রের জনক হিসেবেই বর্তমানে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন।

অটোফেজি কৌশল ব্যাখ্যা ও নতুন গবেষনা দ্বার উন্মোচনে ওসুমির অসামান্য অবদান কে স্বীকার করে তাকে ২০১৬ সালের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top