টাকা-কড়ি

ওষুধশিল্পের ইতিবৃত্ত, দেশে ও বিদেশে

ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নিয়ন আলোয় neon aloy

ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার ব্যাপারটির সাথে পরিচিত নয় এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর বললেও কম হবে। সাধারণ সর্দি কাশি থেকে শুরু করে ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যাধির ওষুধ কিনতে একজন ফার্মাসিস্টের কাছেই যেতে হয়। এই ফার্মেসি আর ফার্মাসিস্ট বলতে আমরা যা জানি তার থেকে অনেক বেশি তাদের ব্যাপ্তি।

ফার্মেসি বলতে আমরা খুব সহজে চিন্তা করে ফেলি রাস্তার মোড়ের ওষুধের দোকান। সেখানে থাকবে হাজার পদের ওষুধ আর তা বিক্রি করবেন ওষুধ বিক্রেতা। তবে ফার্মেসির চিত্র কালান্তরে এখন আমাদের কাছে যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা মোটেই তার আদিরুপ নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ব্যাবিলনে ২৬০০ খ্রীষ্ঠপূর্বে এমন পেশার কিছু মানুষ ছিলেন যারা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ওষুধ তৈরি করে সকল রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন। কিছু ক্ষেত্রে তাদের দোকান থাকতো যেখানে তারা চিকিৎসা করতেন। এটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া একটি ফার্মেসির আদিমতম নিদর্শন। ১১০০ খ্রীষ্ঠাব্দে ইসলামিক স্পেনে একই রকম পেশার মানুষ ছিলেন যাদের আ্যপোথেকার বলা হত। তখনকার সময় আ্যপোথেকারের সামাজিক মর্যাদা আমাদের বর্তমান দিনের ফার্মাসিস্ট বা ডাক্তারের চেয়ে বেশি ছাড়া কম ছিল না। কিন্তু ১৮০০ খ্রীষ্ঠাব্দের শেষ দিকে তাদের অবস্থান দখল করে নেয় নতুন শতাব্দীর ডাক্তার, ফিজিসিয়ান এবং ফার্মাসিস্টরা। একজন আ্যপোথেকারের কাজ ভাগাভাগি হয়ে যায় অনেক গুলো পেশার মোড়কে। ডাক্তার চিকিৎসা করবেন তার বুদ্ধি আর হাতের কারসাজি দিয়ে, ফার্মাসিস্টের কাজ হবে ওষুধ বানানো ও সংরক্ষণ। এটা সত্য মেনে পৃথিবীর অনেক দেশে ফার্মাসিস্ট এর প্রতিশব্দ হল আ্যপোথেকার। শিল্পবিপ্লব কে পুঁজি করে অনেক আ্যপোথেকার তাদের পারিবারিক ব্যবসা বাঁচিয়ে রেখে জন্ম দেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির।

ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নিয়ন আলোয় neon aloy

আ্যপোথেকারেরা ওষুধ প্রস্তুতের কাজে যেসব উপাদান ও সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতেন

ওষুধ প্রস্তুতশিল্প ২০১৩ সালের মোট লাভের দিক থেকে প্রথমস্থান নিয়ে ফেলেছিল তেল, গ্যাস ও গাড়ি প্রস্তুতশিল্পকে পিছনে ফেলে। এই ওষুধ প্রস্তুতশিল্পের সাথে জড়িত পেশাদাররা হলেন ডাক্তার, ওষুধ তৈরিকারক কোম্পানির সকল কর্মকর্তা এবং সেই সাথে আপনার রাস্তার মোড়ের “ফার্মাসিস্ট”। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গুলোর আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সামগ্রিক নাম হল “বিগ ফার্মা”। বিগ ফার্মা তৈরি ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশের বাজারে সর্বাত্মক আধিপত্য নিয়ে বিরাজ করে। তৈরি ওষুধের বাজারে ২০১৪ সালের সামগ্রিক বিক্রির পরিমাণ ছিলো ১ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৬৫% এর বেশি এসেছিলো বিগ ফার্মার অন্তর্ভুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে।

বিপুল অর্থবহুল এই শিল্পখাত শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে দুইভাগে বিভক্ত। প্রথমত আর অ্যান্ড ডি (Research & Development), যেখানে ওষুধ প্রস্তুত সংক্রান্ত বিষয় বিবেচনা করা হয়। দ্বিতীয়ত বিক্রয় ও প্রশাসন, যার মূল বিবেচ্য বিষয় হল মুনাফা এবং সেই সাথে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বাধীনতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মাসিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট ডিগ্রীধারি যে কেউ প্রস্তুত বিষয়ক দায়িত্ব গুলো পালন করে থাকেন যদি তার দায়িত্ব সংক্রান্ত দক্ষতা থাকে। তবে এর মধ্যেই তাদের পরিসর সীমাবদ্ধ না। একজন ফার্মাসিস্ট বা বায়োকেমিস্ট বিক্রয় সংক্রান্ত কাজও করেন। উন্নত বিশ্বে সাধারন ওষুধ বিক্রয়ের দোকানে একজন ডিগ্রীধারি ফার্মাসিস্ট থাকেন যার অনেক দায়িত্বের মধ্যে একটি হল প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ বিক্রি করা। একটি সাধারণ চিত্রে, একজন অসুস্থ ব্যক্তি তার ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রেসক্রিপশন নেয়ার পর বাজার থেকে ওষুধ কিনতে পারবেন। আমদের দেশে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন, যার শুরু ১৯৭৩ সালে। যুক্তরাজ্য উদ্ভুত আই.সি.আই পি. এর উদ্যোগে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে আই.সি.আই ম্যানুফ্যাকচারার্স, যা বর্তমানে এ.সি.আই লিমিটেড নামে পরিচিত। তারপর ১৯৮০’র দশকে জার্মান ও মার্কিন দুটি কোম্পানির মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে যাত্রা শুরু করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এই শিল্পে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য আরো অনেক নামের মধ্যে আছে ইনসেপটা, স্কয়ার। বাংলাদেশে এই মূহুর্তে নিবন্ধিত  ফারমাসিউটিক্যালস কোম্পানির সংখ্যা দুই শতাধিক। এই কোম্পানি গুলো দেশের ওষুধ চাহিদার ৯৫% পূরণ করে।

বাংলাদেশে প্রত্যেক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর চাকুরীতে গড়ে ৩০০ টি পদ থাকে যার মধ্যে অন্যতম হল রিসার্চার, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, ফ্যাসিলিটি ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি কনট্রোল, প্রোডাকশন লাইন, মার্কেটিং, ফাইন্যান্স, এবং সেই সাথে প্রশাসন বা আ্যডমিনিসট্রেশন। বাংলাদেশের বিখ্যাত ওষুধ শিল্প ম্যাগাজিন “ফার্মা মিরর” ২০১৩ সালে ১২৫জন ওষুধ শিল্পের উপর নির্ভরশীল চাকুরিজীবিদের নিয়ে একটি সার্ভে পরিচালনা করে। যার ডেমোগ্রাফিক রিপোর্ট অনুসারে, ৪২% ফার্মা প্ল্যান্টে, ৩৮% মার্কেটিং, ৮% প্রশিক্ষণে, ৫% হাসপাতাল সংলগ্ন ফার্মেসিতে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৯% ফার্মাসি(স্নাতক), ৫৭% ফার্মাসি(স্নাতকোত্তর),  এবং ৬% এম.বি.এ ডিগ্রীধারি। রিপোর্ট এর ব্যাপকতা বিবেচনা করতে এটাও জেনে রাখা উচিত যে তৈরি ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের চাকরি বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম যোগানদাতা। উন্নত বিশ্বের সাথে পার্থক্য এটুকুই যে, সাধারণ ওষুধের দোকানে চাকরি না পেলেও মার্কেটিং বিষয় চাকরি ভালো মতই পাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় পাশ তরুণরা। ওষুধের দোকানের “ফার্মাসিস্ট” এখনও দোকান মালিক বা তার আত্মিয় হন, নতুবা ওষুধ দোকান সংলগ্ন ডাক্তারের চেম্বার থেকে ডাক্তারই ওষুধ সরবরাহ করেন। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলে মেয়েরা গবেষণা পর্যন্ত খুম কমই পৌছায়। ফার্মেসিতে কাজ ও কেমন যেন অমর্যাদাকর হয়ে আছে সুশীল সমাজে। তবে এই চাকুরী গুলো না করতে পেরে মার্কেটিং বেছে নিচ্ছে অনেকে। এই কাজটাই সহজলভ্য। কিন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে দৃশ্য ঠিক বিপরীত। আগামীতে গবেষণাখাতেই মানুষ খুঁজবে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি গুলো। মার্কেটিং চাকরির সজলভ্যতা এ কারণে কমে আসবে আগামীদিন গুলোতে। যার প্রভাবে হয়তো বাংলাদেশে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি বই অন্য কিছুই হবে না।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top