বিশেষ

বিরক্তির অপর নাম “ফোনোলাইভ অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা”

ফোনোলাইভ নিয়ন আলোয় neon aloy

বেশ কয়েক বছর আগের কথা; বাংলাদেশের জনপ্রিয় অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড নেমেসিস একটা ফোনোলাইভ কনসার্টে পারফর্ম করছে। মাহের খান আর ওমায়ের তখনও ব্যান্ডে নিয়মিত লিড গিটার বাজাচ্ছিলেন, ডিও ড্রামসে, রাতুল বেজ-এ এবং জোহাদ ভোকালে অসাধারণ শোম্যানশিপের পরিচয় দিচ্ছিলেন। আউটপুটে চমৎকার সাউন্ড আসছিলো।  তার কিছুদিন আগেই নেমেসিসের “তৃতীয় যাত্রা” অ্যালবামটি রিলিজ হয়েছিলো, তাই অনেকেই প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে লাইভ কনসার্টটি উপভোগ করছিলেন। “বীর” গানটার শেষের দিকে যখন মাহের খানের প্লাকিং করে গানটা বিল্ডআপ করার কথা, তখন ভেসে আসলো উপস্থাপিকার কণ্ঠ- গান শেষ হওয়ার আগেই তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে চমৎকার সঙ্গীত পরিবেশনার জন্য ব্যান্ডকে মেকি অভিনন্দন জানাতে শুরু করে দিয়েছেন! তার সাথে আমরা লক্ষ্য করলাম ব্যান্ডের সবাই একটু বিব্রতকর অবস্থায় পরে গেছেন। যদিও জোহাদের উপস্থিত বুদ্ধিতে সব কিছু ঠিক রেখে নেমেসিস গানটি শেষ করেছিলো।

আরেক ফোনোলাইভ কনসার্টে দেশের জনপ্রিয় থ্র্যাশমেটাল ব্যান্ড পাওয়ারসার্জ যখন অসাধারণ পারফরমেন্স করছিলো, তখন তাদের নিজস্ব একটি গান শুরু করার আগ মুহূর্তে উপস্থাপিকা আকস্মিক জিজ্ঞেস করে বসেছিলেন যে গানটি কি পাওয়ারসার্জেরই মৌলিক গান কিনা! তখন ব্যান্ডের ভোকাল জামশেদ চৌধুরী বেশ বিরক্ত হয়েই বলেছিলেন, “না এইটা আমাদের লেখা না, অন্য একটা ব্যান্ডের লেখা”। কে জানে, হয়তো উপস্থাপিকা সেটাই বিশ্বাস করে বসেছিলেন এবং এখনো হয়তো সেই গানটি পাওয়ারসার্জের কভার করা গান হিসাবেই জানেন, অথবা কখনো জানার চেষ্টাও করেননি পরে!!

এছাড়াও আর্টসেল, ওয়ারফেজ, ক্রিপটিক ফেইট, শিরোনামহীন, ব্ল্যাকের মত আরও অনেক প্রথম সারির ব্যান্ডের ফোনোলাইভ কনসার্টে আমরা দেখেছি উপস্থাপিকার নির্বুদ্ধিতায় পারফর্মারদের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি দর্শকরা অনেক আগ্রহ নিয়ে কনসার্টটি উপভোগ করতে থাকেন, তখন এই ধরনের ঘটনা তাদের কাছে চরম বিরক্তিকর হয়ে উঠে। মাঝে মাঝে আমন্ত্রিত ব্যান্ডের পারফরমেন্সেও বোঝা যায় উপস্থাপিকার নির্বুদ্ধিতায় তারাও যারপরনাই বিরক্ত।

ফোনোলাইভ নিয়ন আলোয় neon aloy

স্টুডিও মাতাচ্ছে মেঘদল, অথচ উপস্থাপিকা নিরাসক্ত, নির্বিকার!

উপরের লেখাগুলো পড়ে আপনার হয়তো ভুল ধারণা হতে পারে যে আমরা কি দেশের ফোনোলাইভ উপস্থাপিকাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম কিনা? কখনোই না! আমরা সাধারণ দর্শক, ভুক্তভোগী সঙ্গীতপ্রেমী, যাদের সাথে বছরের পর বছর ধরে টিভি চ্যানেলগুলো প্রতারণা করে যাচ্ছে অযোগ্য এবং অদক্ষ মানুষের হাতে লাইভ অনুষ্ঠান সঞ্চালনার গুরুদায়িত্ব তুলে দিয়ে।

ফোনোলাইভ কনসার্টের বিষয়টি সারাবিশ্বের মাঝে বাংলাদেশেই প্রথম চালু হয় একুশে টিভি’তে, এর আগে কোনদেশের কোন চ্যানেলেই এরকম অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়নি কখনো!

অথচ ফোনোলাইভ কনসার্টের পেছনের ইতিহাস গর্ব করার মতই ছিল। ২০০৭ সালের দিকে প্রডিউসার পারভেজ চৌধুরীর কনসেপ্টে বেসরকারি চ্যানেল একুশে টিভি’তে ফোনোলাইভ স্টুডিও কনসার্ট নামে এই ধরনের অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়, ডিরেক্টর ছিলেন পারভেজ চৌধুরী নিজেই। আরও একটি বিষয় যা সবার জানা উচিৎ সেটা হল, এই ধরনের কনসার্টের ধারণা শুধু বাংলাদেশে না, সারা বিশ্বেই প্রথম ছিল। শ্রোতাদের পছন্দের ব্যান্ডগুলোকে ভাল ভাবে জানার বা তাদের গান আরও ভাল ভাবে শোনার, মুলত জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোকে তাদের শ্রোতাদের আরও কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় এই অনুষ্ঠানটি।

তখন অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন দেশের পপ রক ঘরানার পরিচিত নাম- আলিফ আলাউদ্দিন, যিনি এখন পর্যন্ত এই ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল এবং জনপ্রিয় উপস্থাপিকা। হালের আলোচিত মিউজিক্যাল শো “মিউজিক বাজ”-ও তিনি উপস্থাপনা করছেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যদিও প্রায় প্রতিটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলেরই নিজস্ব ফোনোলাইভ প্রোগ্রাম আছে, তবু প্রায় সব জায়গায়ই শিল্পীদের সাথে সাথে শ্রোতাদেরও বাজে ধরনের উপস্থাপনার ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে।

প্রথম কথা হচ্ছে এই ধরনের অনুষ্ঠানে কোন ধরনের সঞ্চালকেরই হয়তো দরকার নেই কারন প্রতিটা ব্যান্ডেই এমন একজন থাকেন যিনি নিজেই ব্যান্ড সম্পর্কে বলেন এবং নিজেদের গান সম্পর্কে বলেন। যেমন ব্ল্যাক লাইভে আসলে টনি কথা বলেন, ওয়ারফেইজে এ দায়িত্বটা পালন করেন টিপু, আর্টসেলের সময় সেজান কথা বলতেন। তবু টিভি অনুষ্ঠানের গ্ল্যামার বাড়ানোর খাতিরে যদি শুধুমাত্র “চেহারা সুন্দর” কোটায় উপস্থাপক অথবা উপস্থাপিকা রাখা হয় যে কিনা কনসার্টে আমন্ত্রিত শিল্পী বা ব্যান্ডের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কিছু জানেনা আর প্রতিটা গানের পরেই “ওয়াও, জোস, পাওয়ারফুল” ছাড়া আর কিছুই বলতে পারে না, তাহলে কনসার্ট থেকে শ্রোতা এবং আমন্ত্রিত ব্যান্ড সবারই মন উঠে যায়। অনেক সময় দেখা যায় অনেক উপস্থাপকই না জেনে শিল্পীদের নিয়ে অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলতে থাকেন, যা শুনে শিল্পীদের গান করার উৎসাহে ভাটা পরে। পরিস্থিতি এখন এমন একটা অবস্থাতে দাঁড়িয়েছে যেখানে মনে হচ্ছে এই অজ্ঞ উপস্থাপকদের কাছে ব্যান্ড, সোলো আর্টিস্ট, দর্শক সবাই জিম্মি।

ফোনোলাইভ নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশের প্রথম ফোনোলাইভ কনসার্টের উপস্থাপিকা আলিফ আলাউদ্দিন, এখনো যার সপ্রতিভ উপস্থাপনায় মুগ্ধ টিভি দর্শক

আলিফ আলাউদ্দিন, বাংলাদেশের মিউজিক্যাল সিনারিওর সাথে অনেক ভাবেই যুক্ত। তিনি দেশের প্রথম দিককার পপ রক ঘরানার ভোকাল ছিলেন পেন্টাগন ব্যান্ডে, এখন ফোরটিন্থ ফ্লোরের ভোকাল এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেল একাত্তর টেলিভিশনের ডেপুটি এডিটর অফ মিউজিক হিসেবে কাজ করছেন। তাই অনেকে হয়তো বলবেন এই কারনেই তিনি এত সফল হয়েছেন। কিন্তু “মিউজিক বাজ” অনুষ্ঠানটিতে তাকে অনেক নতুন আর্টিস্টকেই দর্শকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়, যেখানে তার উপস্থাপনার স্টাইল দেখেই বোঝা যায় তিনি কতটুকু আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করেন শিল্পীদের নিয়ে জানতে। যারা এই ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন, বা ভবিষ্যতে করতে আগ্রহী, তারা অন্তত আলিফ আলাউদ্দিনের স্মার্টনেস তো ফলো করতে পারেন, না?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সবার কাছেই এখন স্মার্ট ফোন আছে, আছে ইন্টারনেট, যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আপনি উইকিপিডিয়া বা অন্যান্য তথ্যসূত্র থেকে শিল্পীদের সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সুন্দরভাবে তাদের উপস্থাপন করতে পারেন, যা আপনাদেরকেও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এ ধরণের অনুষ্ঠানে একজন উপস্থাপক হিসেবে আপনার দায়িত্ব অনুষ্ঠানের শোভাবর্ধন করা, দর্শক-শ্রোতাদের সাথে শিল্পীর সংযোগস্থাপনের কাজটা মসৃণ করা। কিন্তু এই প্রাথমিক কাজটুকু সম্পন্ন করা তো দুরের কথা, আপনি যদি উল্টো অনুষ্ঠানের (এবং সেই সাথে চ্যানেলেরও) সৌন্দর্য্য নষ্ট করতে থাকেন, শিল্পীদের মুড নষ্ট করতে থাকেন আপনার অজ্ঞতাপ্রসূত বাচালতা এবং মেকি ন্যাকামি দিয়ে, তাহলে আপনার আসলেই এই ধরনের অনুষ্ঠানের অংশ হওয়া উচিৎ নয়।

তবে আশার কথা হচ্ছে অনেকেই এখন ভাল উপস্থাপনা করতে চেষ্টা করছেন এবং বেশ ভাল উপস্থাপনা করছেনও। যেমন এসএ টিভি’র “এসএ লাইভ স্টুডিও” এর ফুয়াদ, যমুনা টিভি’র “ছুটির রাতে” মিউজিক্যাল শো-এর উপস্থাপক এবং ওয়ারফেইজের বর্তমান ভোকাল পলাশের প্রশংসা না করলে অন্যায় হবে।

আরেকজন মানুষের কথা বলতেই হবে যিনি অনেক নতুন ব্যান্ডকে প্রমোট করছেন, সেইসাথে অনেক সোলো আর্টিস্টকেও তার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে তুলে ধরছেন। মানুষটির নাম জয় শাহরিয়ার। তার উপস্থাপনাও অনেক সাবলীল ছিলো মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের “আড্ডা আর গান” অনুষ্ঠানে।

বাংলাদেশের লেজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুও আরটিভিতে “আর মিউজিক” নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতেন। এছাড়া আরও অনেকেই ফোনোলাইভে একসময় ভাল উপস্থাপনা করলেও পরবর্তীতে তা আর চালিয়ে যাননি।

সামনে ঈদ-উল-আযহা। এই উপলক্ষে প্রায় প্রত্যেকটি চ্যানেল হয়তো এই ফোনোলাইভ কনসার্ট আয়োজন করবে। কিন্তু সব প্রডিউসার এবং চ্যানেল কর্তৃপক্ষেরই এই স্মার্ট উপস্থাপনার বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত, তা না হলে এই সুন্দর আয়োজনগুলো বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে দর্শকদের কাছে। কারণ একসময় হয়তো আমরা অনেক গতানুগতিক চিন্তাভাবনা করতাম এইসব বিষয় নিয়ে, কিন্তু এখন দর্শকদের এইসব বিষয় নিয়েও ভাবায়।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ আর্টিকেলটিতে ব্যবহৃত সকল ছবি এসএ লাইভ স্টুডিও এবং একুশে টিভি ফোনোলাইভ স্টুডিও কনসার্টের ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত।

Most Popular

To Top