টেক

অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন – কাপকেক থেকে ন্যুগাট

বর্তমান প্রযুক্তিবিশ্বে একটি অতিপরিচিত নাম হলো-“অ্যান্ড্রয়েড”। রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদার থেকে শুরু করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির পরিচালক পর্যন্ত সবার হাতের নাগালেই এখন অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন। ব্যাস্ততায় নিমজ্জিত মানুষের পৃথিবীকে প্রযুক্তিগতভাবে সহজ করায় অনবদ্য এক ভূমিকা পালন করছে এই অপারেটিং সিস্টেম। মুভি দেখা, গান শোনা, বই পড়া, প্রেজেন্টেশান বানানো, ইন্টারনেট ব্যবহারসহ প্রায় সবধরনের কাজই করা যায় অ্যান্ড্রয়েডের মাধ্যমে।

অ্যান্ড্রয়েড প্রকৃতপক্ষে হল স্মার্টফোন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেটিং সিস্টেম। বহির্বিশ্বে বিপ্লব ঘটানো এই মোবাইল ওএস’টি প্রথম বাজারে আসে ২০০৭ সালের ৫ই নভেম্বর। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী অপারেটিং সিস্টেমগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু অ্যান্ড্রয়েডের এ সাফল্য রাতারাতি আসেনি। ২০০৭ সাল থেকে শুরু এ অপারেটিং সিস্টেমটি অনেক চড়াই-উতরাই এর উপর দিয়ে গিয়ে আজকের এ অবস্থানে এসেছে। চলুন দেখে নেয়া যাক আজকের “অ্যান্ড্রয়েড” এর এই পর্যায়ে উঠে আসার পিছনের ধাপগুলো। 

 

অ্যান্ড্রয়েড ১.৫ (Cupcake)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ১.৫ কাপকেক

অ্যান্ড্রয়েড ১.৫ (Cupcake) হল এই সিরিজের বাজারে আসা প্রথম অপারেটিং সিস্টেম। অ্যান্ড্রয়েডের প্রাথমিক এ সংস্করণে বেশ কিছু মজাদার আপডেট আসে যার মধ্যে অন্যতম হলো স্ক্রীনটাচ টাইপিং। এছাড়া এ সংস্করণে ইউটিউব ও পিকাসায় ছবি ও ভিডিও আপলোড দেয়ার ব্যবস্থাও ছিল। উল্লেখ্য, অ্যান্ড্রয়েডের কাপকেক সংস্করণ টি-মোবাইলের জিওয়ান সেটটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাজারে চালু রাখে।

 

অ্যান্ড্রয়েড ১.৬ (Donut)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ১.৬ (Donut)

অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণটি বাজারে তুমুল হইচই ফেলে দেয়। অ্যান্ড্রয়েড ডোনাটে ছিল ইউনিভার্সাল সার্চ, টেক্সট টু স্পিচ ও সিডিএমএ কম্প্যাটিবিলিটির মত ফিচার। অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণটি বাজারে আসে ২০০৯ সালের ১লা অক্টোবরে

 

অ্যান্ড্রয়েড ২.০ (Éclair)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ২.০ (Éclair)

অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় এ সংস্করণে ছিল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সাপোর্ট, ডিজিটাল জুম, লাইভ ওয়ালপেপারসহ বেশকিছু চিত্তাকর্ষক ফিচার। উল্লেখ্য, অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণেGoogle একটি স্মার্ট-কিবোর্ডের উদ্বোধন করে যা সাজেশান মোতাবেক কন্টাক্ট লিস্ট থেকে কন্টাক্ট সাজেস্ট করটে সক্ষম ছিল

 

অ্যান্ড্রয়েড ২.২ (Froyo)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ২.২ (Froyo)

অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণটি মূলত অপারেটিং সিস্টেমের স্পীড নিয়েই কাজ করেছে। ফ্রোয়ো নিয়ে GIZMODO-এর (একটি প্রযুক্তি-বিষয়ক ওয়েবসাইট) মার্ক বুকানন বলেছেন, “অ্যান্ড্রয়েড ২.২ এর স্পিডবুস্ট খুবই চমৎকার। কিন্তু অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন ইতিহাসে ফ্রোয়োকে একটি চমৎকার আপডেট হিসাবে ধরা হয় পুরো প্লাটফর্ম ধরেই এর আপগ্রেডেশনের কারণেঅ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণে একটি পূর্নাঙ্গ অপারেটিং সিস্টেমের যেসব ফিচার থাকা উচিত তার সবই রয়েছে”। ফ্রোয়োতে খুব সহজেই ডায়ালার ও অ্যাপ ড্রয়ারে যাওয়ার জন্য একটি বটম ডক যোগ করার মত অভিনব ফিচার প্রথমবারের মত যুক্ত হয়

 

অ্যান্ড্রয়েড ২.৩ (Gingerbread)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ২.৩ (Gingerbread)

অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করনেই Google প্রথমবারের মত অ্যান্ড্রয়েডের আকার ও গঠন নিয়ে কাজ করে। অপারেটিং সিস্টেমের ইন্টারফেস একটি গাঢ় রঙের থিম দ্বারা পরিবর্তন করা হয়। এছাড়াও অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণে NFC (Near Field Communication) এর মত শক্তিশালী ডাউনলোড ম্যানেজারের জন্য সাপোর্ট যোগ করা হয় এবং কপি-পেস্টের মত সাধারণ ফিচারও উন্নত করা হয়।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৩.০(Honeycomb)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৩.০(Honeycomb)

অ্যান্ড্রয়েড ৩.০ সংস্করণে প্রাথমিকভাবে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে পরিচালিত ট্যাবলেটের উপরই প্রাধান্য দেয়া হয়। ২০১০ এর শেষের দিকে আইপ্যাড বাজারে আসার পরেই ট্যাবলেট কম্পিউটারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অ্যান্ড্রয়েডের একটি অপারেটিং সিস্টেমের দরকার হয় এবং এর থেকেই হানিকম্বের উদ্ভব। অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণেই হলোগ্রাফিক ইন্টারফেসের ব্যবহার শুরু হয় এবং বড় আকারের ট্যাবলেটে ব্যবহারের জন্য ইন্টুইটিভ কি-বোর্ড সুবিধা যোগ করা হয়। অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন এর ধারাবাহিকতায় এই সংস্করণটি আপাতদৃষ্টিতে সে সময় মোবাইল ফোনে ব্যবহারের জন্য কিছুটা বেমানান ছিলো বলা যায়।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৪.০ (Ice-cream Sandwich)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৪.০ (Ice-cream Sandwich)

আইসক্রিম স্যান্ডউইচ আপডেট করা ইন্টারফেস ও হার্ডওয়্যার বাটনের বিগঠনের মাধ্যমেই নতুন করে বাজারে আসে। অ্যান্ড্রয়েডের এ সংস্করণটি ছিল হানিকম্ব ও জিঞ্জারব্রেডের একটি সংযোগস্বরুপ। আইসক্রিম স্যান্ডউইচে ভার্সনে অ্যাপগুলো আরো বেশী শক্তিশালী ছিল। মাল্টিটাস্কিং এ অপারেটিং সিস্টেম হয়ে উঠে প্রায় কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমের মতই শক্তিশালী। তাই অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন এর ধারাবাহিকতায় এ সংস্করণটিকে ধরা হয় “অ্যান্ড্রয়েডের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আপডেট” হিসাবে।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৪.১ (Jellybean)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৪.১ (JELLYBEAN)

অ্যান্ড্রয়েড ৪.১ এ আসে গুগল অ্যাপের মত ফিচার যা অ্যান্ড্রয়েডের জনপ্রিয়তাকে তুমুলভাবে বাড়িয়ে তুলে। জেলিবিনে ছিল উন্নত ভয়েস-এসিস্ট্যান্ট, যাতে সার্চ এবং নোটিফিকেশান চেক করা অনেক সহজ হয়ে যায়। এছাড়াও জেলিবিনে হোমস্ক্রীন এমনভাবে পুনর্গঠিত করা হয় যেন উইজেটগুলোর মাপ পরিবর্তন করে হোমস্ক্রীনে সুবিধামত যেকোনো জায়গায় টেনে নিয়ে বসানো যায়।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৪.৪ (Kitkat)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৪.৪ (KITKAT)

 

কিটক্যাট বাজারে আসে জেলিবিন ছাড়ার এক বছরেরও পরে, ২০১৩ সালের হ্যালোইন উৎসবে নেক্সাস ৫ হ্যান্ডসেটের সাথে। গুগল অ্যাপ এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কার্যকরী হয় কারণ এতে থাকে ব্যবহারকারীদের সার্চ অনুমান করার দূরদর্শিতা। এছাড়াও অ্যান্ড্রয়েডের হ্যাংআউট অ্যাপটির আপগ্রেডের মাধ্যমে মোবাইলে এসএমএস এর ব্যবহার আরো সহজ হয়ে যায়। তবে অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন এর ধারাবাহিকতায় এ সংস্করনের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হল অপারেটিং সিস্টেমের ফুটপ্রিন্টের সাইজ ছোট করে ফেলা যার ফলাফলস্বরুপ মাত্র ৫১২ মেগাবাইট র‍্যামের ভিতরেও একটি OS নিখুঁতভাবে চলতে পারে।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৫.০(Lollipop)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৫.০(LOLLIPOP)

অ্যান্ড্রয়েড ৫.০ এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল আইস্ক্রীম স্যান্ডউইচ এর উপর ভিত্তি করে গুগলের ম্যাটেরিয়াল ডিজাইনিং এর মাধ্যমে আইকন, অ্যানিমেশান, মাল্টিটাস্কিং মেন্যুর পরিবর্তন- যা অপারেটিং সিস্টেমটিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। এ সংস্করণে আরো উন্নত নোটিফিকেশান ইন্টিগ্রেশান এর জন্য অ্যান্ড্রয়েড লকস্ক্রীন আরো কার্যকরী হয়ে উঠে। এছাড়াও ললিপপে গুগল থার্ড পার্টি ডেভেলপারদের মাধ্যমে ডিভাইসে “Google Now” লঞ্চ করার ফিচার যোগ করা হয়। এছাড়াও এ সংস্করনে “Silent mode”-এ নোটিফিকেশান আসার ফিচার যুক্ত হয়।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৬.০ (Marshmallow)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৬.০ (MARSHMALLOW)

অ্যান্ড্রয়েড ৬.০-তে নতুনভাবে অ্যাপ পারমিশন পরিচালনা করার ফিচার যোগ করা হয় এবং “Google Now” আরো কার্যকরীভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও এতে আছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর সাপোর্ট ও গুগলের ডুয ও অ্যান্ড্রয়েডের সেন্সরহাব একত্রিত করে গড়া উন্নত ব্যাটারি লাইফ।

 

অ্যান্ড্রয়েড ৭.০ (NOUGAT)

Neon Aloy অ্যান্ড্রয়েডের বিবর্তন

অ্যান্ড্রয়েড ৭.০ (NOUGAT)

NOUGAT হল অ্যান্ড্রয়েডের সর্বশেষ রিলিজপ্রাপ্ত সংস্করণ। এতে রয়েছে অনেকদিন ধরেই অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের আকাঙ্ক্ষিত ফিচার মাল্টি-উইন্ডোড সাপোর্ট। অর্থাৎ অ্যান্ড্রয়েডের এই সংস্করনে স্ক্রীন বিভক্ত করে আলাদা আলাদা প্রোগ্রাম অথবা অ্যাপ চালানো যাবে। যদিও NOUGAT ম্যাটেরিয়াল ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে তৈরী যা ২০১৪ সালে ললিপপের মাধ্যমে শুরু হয়, ন্যুগাটে আরো ভাল ডিজাইন। এছাড়া সম্প্রতি বেটা রিলিজ হওয়া এই সংস্করণে আরো কার্যকরী নোটিফিকেশান সিস্টেমের উপর প্রচুর কাজ হয়।

সুতরাং, বলা চলে যে, অ্যান্ড্রয়েড অনেক বড় পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমানবিশ্বে একটি অত্যাধুনিক ও মসৃন অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু যেহেতু উন্নতির কোনো শেষ নেই, তাই আশা করা যাচ্ছে যে, ভবিষ্যতে অ্যান্ড্রয়েডের আরো ভাল আপডেট এসে প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্ববাসীর কাছে আরো নিরাপদ ও সহজ করে গড়ে তুলবে।

Most Popular

To Top