গল্প-সল্প

“চে” নামের একটা অবাধ্য ছেলে

চে-নামের-একটা-অবাধ্য-ছেলে

পৃথিবীর শেষ বুলেটটি নেড়েচেড়ে দেখছে ক্রুশো, নয় মিলিমিটারের মসৃণ একটা বুলেট, আশ্চর্য রকমের সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে গোটা শরীরটা জুড়ে। পৃথিবীতে একটা সময় ছিল যখন শস্য কণার চেয়ে বেশি পাওয়া যেত বুলেট, সময়টা আজ থেকে খুব একটা বেশি আগের কথা নয়। মানুষ যতনা বেশি খাদ্য শস্য উৎপাদন করত তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি করত বুলেট, শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্বকে বারবার মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে যাওয়া বুলেটের তীক্ষ্ণ মাথা। এরপর একটা সময় খাদ্যের বড় অভাব দেখা দিল, সবার হাতে আছে আগ্নেয়াস্ত্র, ছোট ছোট নয় মিলিমিটারের বুলেট, কিন্তু ঘরে খাবার নেই। শিশুরা ভাত চেনার বদলে চিনতে শুরু করল বুলেটের খোসা, মানুষ মানুষকে হত্যা করা শুরু করল শুধু ভাতের প্রয়োজনে। সে যুদ্ধে বাঁচতে পারেনি তারা কেউই, বাঁচতে পেরেছিল তারাই যারা কৃত্রিম এই যুদ্ধটি সৃষ্টি করেছিল। যারা প্রচুর পরিমাণে বুলেট তৈরি করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছিল, যারা বলেছিল তাদের কাছে কোন খাবার নেই, অথচ তাদের গোলা ভর্তি ছিল ধান, যারা খবর ছড়িয়ে ছিল খাবার আছে পাশের দেশে, চল আক্রমণ করি। বুলেটে বুলেটে রক্ত বেড়ে যায়, শিশুরা মাকে জড়িয়ে ধরার বদলে ছোট্ট হাতে ধরতে শেখে সিজেট পচাত্তর বি পিস্তল। এসব ভাবতে ভাবতে হেসে ওঠে ক্রুশো, হ্যা, ক্রুশো তাদেরই বংশধর যারা যুদ্ধটা বাঁধিয়েছিল। সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধটা ছড়িয়ে পড়েছিল, সত্যটা এতটুকুই পৃথিবীতে শুধু বেঁচে ছিল শাসকেরা আর শোষিতরা নিজেদের মাঝে বুলেট ছড়াতে ছড়াতে মিশে গেছে রক্ত বন্যায়।

এরপর শোষকে শোষকে কোন্দল বাঁধে, শক্তিশালী শোষকেরা দুর্বল শোষকদেরকে নিজেদের প্রজা বানিয়ে শুরু করে নতুন রাষ্ট্রতন্ত্র। বন্ধ করে দেয়া হয় সকল লাইব্রেরী, বিজ্ঞানের অধিকার চলে যায় শুধু ক্রুশোদের হাতে। আবিস্কার করা হয় নতুন ভ্যাক্সিন, যা বাধ্যতামূলক করা হয় সকল মানুষের জন্য, সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেয়া ধর্মযাজকদের হাতে। ধর্ম যাজকেরা প্রচার করা শুরু করে যে বা যারা এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেনা তারা হবে নরকের কীট, যে মানুষ এই ভ্যাকসিন না নিয়ে বেঁচে থাকবে তার প্রতিটি নিঃশ্বাস হবে এই পৃথিবীর জন্য অমঙ্গলজনক আর এর জন্য শাস্তি পেতে হবে সমগ্র পৃথিবীবাসীকে। আবিষ্কৃত এই ভ্যাকসিনের বিশেষত্ব ছিল এই ভ্যাকসিন মানুষের চিন্তা করার শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে, মানুষের মাঝে নীরব প্রশ্নহীন আনুগত্যের সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে নেমে আসে সুখ, জন্মত্বত্তের ভিত্তিতে শৃঙ্খলিত হয় গোটা সমাজ। শ্রমিকের ছেলে বড় হয়ে হয় শ্রমিক, ভিখিরির ছেলে ভিখিরি, রাজার ছেলে রাজা। কোন প্রশ্ন নেই, কক্ষনো কেউ করেও না কেন গরিবেরা সবসমই গরীব থাকবে, অধিকার নামক শব্দটা হারিয়ে গেছে কয়েক শতাব্দী আগে, পুরোটাই ভ্যাকসিনের কৃতিত্ব।

ক্রুশোর মুখে এবার হাসিটা বেশ বড় করে ফুটে ওঠে, এত্তসব জটিল হিসেব নিকেশ করে পৃথিবীতে শান্তি আনা মানুষটির নাম মহামান্য ক্লিয়াস, যিনি সম্পর্কে ক্রশোর গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার। ক্রুশোদের ভ্যাকসিন নিতে হয়নি, রাজার ছেলেরা রাজা হবে, তাদেরকে নিজেদের মত ভাবার অধিকার দেয়া হয়েছে, মহামান্য ক্লিয়াসকে আরেকবার ধন্যবাদ দেয় ক্রুশো।

ক্রুশো বড় শান্তিপ্রিয় মানুষ। আইন করে সে বুলেট তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। আজ ক্রুশোর আদেশে একটি মাত্র বুলেট তৈরি করা হয়েছে চে নামের একটা অবাধ্য ছেলের জন্য। চে বড় অবাধ্য ছেলে, খুব সম্ভবত সে ভ্যাকসিন গ্রহণ না করা কোন নরকের কীট, তা না হলে কেউ কি বলতে পারে যে ক্রুশোর বাবা রাজা তাই সে রাজা হয়েছে আর চের বাবা শ্রমিক তাই সেও শ্রমিক, শ্রমিকদের অধিকার থাকে না, সব অধিকার থাকে রাজাদের। যে শব্দটা অভিধানের চিপায় হারিয়ে গিয়েছিল সেই শব্দটা ছেলেটি জানল কি করে, নিশ্চয়ই সে অবাধ্য কোন লাইব্রেরীর সন্ধান পেয়েছে। এক কথায়, চে ছেলেটি ক্রুশোদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ধর্মযাজকেরা ঘোষণা করে দিয়েছে চে হচ্ছে নরকের কীট, এই পৃথিবীতে তাকে আর বাঁচিয়ে রাখাটা উচিত হবেনা। এজন্য মহামান্য ক্রুশো জনসম্মুখে চের মাথাতে বুলেট ঢুকিয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করবেন।

ক্রুশোর সামনে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একটি মানুষ, নাম চে। সামনে হাজার হাজার মানুষ। ক্রুশোর হাতে কয়েক শতাব্দী আগের খুব জনপ্রিয় একটি অস্ত্র, সিজেট পচাত্তর বি পিস্তল। ট্রিগারটি টেনে দেবার আগে ক্রুশো সবার উদ্দেশ্য ভাষণ রাখে “চে’রা জন্ম নেয় পৃথিবীতে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য আর ক্রুশোরা জন্ম নেয় পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য”।

একটা বুলেট, পৃথিবীর শেষ বুলেটটি ফুরিয়ে গেছে। এখন পৃথিবীতে শুধু শান্তি। মানুষ চে দের ভালবাসেনা, ভালোবাসে প্রতিদিন অপমানিত হতে, ধর্ষিত হতে, বিক্রি হতে, ভালোবাসে ক্রুশোদের বিশ্বাস করতে, দেবতার মত পূজা করতে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top