বিশেষ

ক্রিপটিক ফেইটঃ দানব, নাকি শ্রেষ্ঠ?

ক্রিপটিক ফেইট

অন্ধকারাছন্ন অডিটোরিয়ামটা প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। মানুষগুলো সবাই একমনে অধীর আগ্রহে সামনে চেয়ে আছে, সবার মনে একটাই- ভাবনা কিছু একটা হবে আজকে এইখানে। কিছুক্ষণ আগেই একটা ব্যান্ড পারফর্ম করে নেমে গেছে, কিন্তু মানুষগুলোর এনার্জি একটুও কমেনি। তারা আরও বেশি শব্দ চায়, আর স্পষ্ট কিছু কথা চায়, আরও অনেক বেশি হারিয়ে যেতে চায় এই ইট-পাথরের জঞ্জাল থেকে। সব কষ্ট, সব বাস্তবতা, সব বানানো নিয়মকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চায় তাদের শরীর থেকে। ঠিক তখনই অদ্ভুত এক নিরবতা চিরে যুদ্ধের বানীর মত শুরু হয়,

“আসমান জুড়ে মেঘেরই ঘনঘটা, নিঃসন্দেহে প্রলয় আসছে ধেয়ে!
আসমান জুড়ে মেঘেরই ঘনঘটা, নিঃসন্দেহে প্রলয় আসছে ধেয়ে!!”

হ্যাঁ, প্রলয়ই আসছে ধেয়ে। সবার প্রতিটা ইন্দ্রিয় ততক্ষণে সচল হয়ে গেছে, স্টেজে একজন একজন করে অতিমানব উঠে আসছে। আবছায়া অন্ধকারের মাঝে সবাই যেন নিজেকে তখন আসন্ন ঝড়ের জন্যে শেষবারের মত ঠিক করে নিচ্ছে।

এরপরই শুরু হল তাণ্ডব, ভয়ঙ্কর শক্তিশালী কিছু ড্রামসের কিকের সাউন্ড সাথে লিড গিটারের চিৎকার সবার করোটিতে যখন আঘাত হানছে তখন লাউড বেজ গিটারের সাউন্ডটা ঠিক বুকে এসে সজোরে আঘাত করতে শুরু করে। সেইসাথে পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে শুরু হলো হেডব্যাং। স্টেজের ডান পাশের একটা ছেলের মাথা তার পাশের ছেলের মুখে এসে লাগে, মুখ কেটে যায়, কিন্তু ছেলেটার কোন বিকারই নেই সেটা নিয়ে। সবকিছু ছাপিয়ে ইস্পাত কঠিন এক কণ্ঠের আবির্ভাব ঘটে, প্রচণ্ড আক্রোশে সে বলে,

“কিভাবে আমাকে তুমি বলবে?
কিভাবে আমাকে শান্ত করবে?
আত্মঘাতী ধ্বংসযজ্ঞ… রাতারাতি যুদ্ধক্ষেত্র…
উন্মাদনায় সবাই মত্ত!!!”

সেই কণ্ঠের সাথে সাথেই সবাই অনুভব করতে থাকে সামাজিক অনিয়ম, অনাচার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা সব রাগ, ঘৃণা। মস্তিষ্কের সকল বোধগুলো তখন ভয়ঙ্কর ক্রোধে সেই একরোখা কণ্ঠের সাথে একযোগে বলতে থাকে,

“সীমাহীন এই রঙ্গমঞ্চে সহ্য করতে পারি না,
মাথায় উঠে রাগ, রক্ত গরম রাগ…
ইচ্ছে করে ওদের ধরে
ঠাণ্ডা মাথায়, হাসিমুখে
গলাটিপে হত্যা করি।”

এতক্ষণ বলছিলাম বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ইতিহাসের সবচাইতে সফল হেভিমেটাল ব্যান্ড ক্রিপটিক ফেইটের একটি কনসার্টের কথা।

ক্রিপটিক ফেইট

লাইভ পারফরম্যান্সে ক্রিপটিক ফেইট

রাস্তার মোড়ে মোড়ে ল্যাম্পপোস্টগুলোতে লাগানো পোস্টারগুলো হয়ত মলিন হতে হতে এখন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে, ব্যানারগুলোর উপরে হয়ত পড়েছে আরও কয়েকশো ব্যানার। কিন্তু জিন্স আর টিশার্ট পড়া সেই ছেলেটির মানিব্যাগে এখনও সেই কনসার্টগুলোর টিকেটের ছেঁড়া অংশটুকু আছে। চায়ের স্টলে অথবা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসলে এখনও সেই কনসার্টগুলোর কথা উঠে এবং সবাই একসাথে হারিয়ে যায় এবিসি জেনারেশনের কনসার্টগুলোতে। আর্টসেল, ব্ল্যাক এবং ক্রিপটিক ফেইট এই তিনটি ব্যান্ডের গানের সুরে মানবিক বোধ গড়ে উঠা মানুষ গুলোর কাছে লাইভ স্কয়ারের ব্যানারে এবিসি জেনারেশনের কনসার্টগুলো ছিল জীবনের সবচাইতে প্রিয় কিছু মুহূর্ত। আর্টসেল এবং ব্ল্যাকের অসাধারণ লাইভ পারফর্মেন্সের পরও ক্রিপটিক ফেইটের লাইভ পারফর্মেন্স সবার থেকে এই জন্যেই এগিয়ে থাকবে কারন তারা হলেন বাংলাদেশের হেভিমেটাল জনরার পাওয়ার হাউজ। মেটালহেডদের কাছে এই ক্রিপটিক ফেইটই হল আয়রন মেইডেন, মেটালিকা, মেগাডেথ, স্লেয়ার, এনথ্রাক্স। এই ব্যান্ডটির লাইভ পারফরমেন্স দেখে  আজকের অনেক প্রথম সারির মিউজিসিয়ানরাই প্রথম হেভিমেটাল সঙ্গীতের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

ক্রিপটিক ফেইট

ABC Generation এর শেষ কনসার্ট

ক্রিপটিক ফেইটের লিরিকগুলো আমাদের সকল সামাজিক ব্যাধি নিয়ে ভাবায়, মানবিক বোধ নিয়ে ভাবায়, দেশ প্রেম নিয়ে ভাবায়। এই লিরিকগুলো হয়তো আমাদের মনে অতটুকু দাগ ফেলতোনা যদি তার পেছনে সাকিব চৌধুরী’র স্ক্রিমিং, ফারহান সামাদ এবং সারফারাজ লতিফুল্লাহ’র শ্রেডিং আর ফারশেদ মাহমুদ এর পাওয়ার ড্রামিং না শুনতাম ।

আমি আমার “হেভিমেটালের শিকড়” লেখাটায় বলেছিলাম, এই হেভিমেটাল জনরা মানুষকে তাদের মনের ভাব আরও স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়। আর সম্ভবত সে কারনেই নিজেদের কৈশোর মনের ক্রোধ আর আক্রোশ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই গিটারিস্ট বন্ধু ওয়াহেদুজ্জামান খান এবং সরফরাজ লাতিফুল্লাহ তাদের স্কুল ফ্রেন্ড সাকিব চৌধুরী, ফারশেদ মাহমুদ, ইরেশ যাকেরকে নিয়ে একটি মেটাল ব্যান্ড ফর্ম করার চিন্তা করেন। আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না যে হালের জনপ্রিয় অভিনেতা ইরেশ যাকের ছিলেন ক্রিপটিক ফেইটের সেই সময়কার লাইন আপের ভোকাল, আর বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভোকাল সাকিব চৌধুরী ছিলেন শুধুমাত্র বেজিস্ট হিসেবে। এবং প্রথম থেকেই ড্রামসে অদ্ভুত সুন্দর গ্রুভ প্লে করতেন ফারশেদ মাহমুদ।

ক্রিপটিক ফেইট

প্রথম দিককার ক্রিপটিক ফেইট

‘৯০ এর দশক এদেশের ব্যান্ড মিউজিকের জন্য স্বর্ণযুগ ছিল- এ বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নাই। কারন বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর জন্মই সেই সময়ে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল অধিকাংশ ব্যান্ড মিউজিক ফ্যানরাও সেই জেনারেশনের। এই জেনারেশনের আপ্রিসিয়েশনেই ব্যান্ডগুলো এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। এক কথায় বলা যায়, ব্যান্ডগুলোর সাথে তাদের শ্রোতাদের সবচেয়ে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো সেই সময়টাতে, যার কারণে এত বছর পরেও শ্রোতারা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে সে সময়কার ব্যান্ডগুলোর অ্যালবাম রিলিজের অপেক্ষায়। যদিও বছরের পর বছর শ্রোতাদের হতাশার আগুনে পুড়তে হয়- তবে সেটা অন্য বিষয় যা নিয়ে অন্য কোন একদিন আলোচনা করা যাবে। সেইসময় গুটিকয়েক ব্যান্ড বাংলাদেশে হেভিমেটাল ধারার গান করার চেষ্টা করছিল অনেকেই আজ সফল এবং বাংলাদেশের মিউজিকাল সিনারিওর বড় বড় নাম। তাদের কথাও যথাসময়ে বলা হবে। কিন্তু ক্রিপটিক ফেইটের নাম সর্বপ্রথমে এই জন্যই বলব কারন যখন অনেকেই কনসার্ট ও মেইন্সট্রিম হিটের অভাবে পপ, ফোক, সোলো কালচারের দিকে ঝুঁকছিলো এবং নিজেদের স্বকীয়তা হারাচ্ছিলো, তখন তারাই প্রথম এদেশের মেটালহেডদের পিউর হেভিমেটালের স্বাদ দেয় “এন্ডস আর ফরেভার” অ্যালবাম দিয়ে যার কথাগুলো ছিল ইংরেজিতে, ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের চিন্তা ভাবনা করা অনেকটাই অকল্পনীয় ছিল এবং পরবর্তীতে ক্রিপটিক ফেইট সেরকম লাউড কিছু অ্যালবাম উপহার দেয় যার কারনে ফ্যানরা সেই সময়কার বাকি ব্যান্ডগুলোকে রিইনোভেট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ‘৯০ এর দশকের পরেও বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড সিনারিওর উন্নতি সাধনে আর্টসেল, ব্ল্যাক, ক্রিপটিক ফেইট এই তিনটি নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ক্রিপটিক ফেইট

অ্যালবাম কভার- Ends are Forever

১৯৯৫ সালে মাত্র নয় শিফট রেকর্ডিং সেশনের পর সাউন্ডটেকের ব্যানারে বের হয় প্রথম অ্যালবাম “এন্ডস আর ফরেভার”, যার পেছনে ক্রিপটিক ফেইটের সাথে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন দেশের ক্ষণজন্মা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ইমরান আহমেদ চৌধুরী মুবিন, যিনি জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিলিংস এবং উইনিং-এ বেজিস্ট হিসেবে ও ব্ল্যাকের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। অ্যালবামটির মুল আকর্ষণ ছিল ওয়াহেদ ও সারফারাজের অসাধারন কিছু রিফ ও স্পিডি গিটার সোলো, ফারশেদের ফাস্ট ড্রামিং এবং সাকিব চৌধুরী’র হাই পিচ ভোকাল । “এন্ডস আর ফরেভার” এর নয়টি গানই পরবর্তীতে ২০০২ সালের রেকর্ড লেবেল জি-সিরিজ থেকে বের হওয়া ক্রিপটিক ফেইটের দ্বিতীয় এবং ইনস্ট্যান্ট হিট অ্যালবাম “শ্রেষ্ঠ”-কে ইন্সপায়ার করেছে। যেখানে প্রথম অ্যালবামের কিছু গান যেমন “ওডিয়াস জেফার”, “এটারনাল” পরবর্তীতে “লোভের আগুন” ও “প্রতিবাদ” গানে রুপ নিয়েছে এবং প্রথম অ্যালবামের পর ওয়াহেদ নিজের বাক্তিগত কারনে বিদেশ চলে গেলে ১৯৯৮ সালে ব্যান্ডের লিড গিটারের হাল ধরেন ফারহান সামাদ।

 

যদিও দ্বিতীয় কন্সেপচুয়াল অ্যালবামটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর করা, তবুও ক্রিপটিক ফেইট কি জানে তারা তাদের শ্রোতাদের মধ্যে স্বতন্ত্র একটা জেনারেশন সৃষ্টি করেছে? এই জেনারেশন বৃষ্টি ভেজা পথে গলে পরা সোডিয়ামের আলো খুঁজতে “ভবঘুরে” হয়, গভীর আবেগ নিয়ে প্রেমিকাকে বলে তুই শুধু “আমার সাথে আয়”, জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে নিজের বিবেকের সাথে “প্রতিবাদ” করে বলে “লোভের আগুন” পুঁড়িয়েছে আমায়। গৌরব গাঁথা মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে থাকা “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” বাণী কিভাবে প্রত্যেকটা তরুনকে নিজের “শ্বেত শুভ্র” মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দিতে “শেষ ট্রেন” ধরতে বাধ্য করেছিল সেটাও ভাবায় এই প্রজন্মকে। সবশেষে এই জাতির “শ্রেষ্ঠ” সন্তানরা যারা নিজের প্রান দিয়ে এই দেশের স্বাধীনতা এনেছিল তাদের কথা এ প্রজন্মের মানুষদের মনের মধ্যে চিরদিনের জন্য খোঁদাই করে দেওয়ার চেষ্টাই এই অ্যালবামের মুল সার্থকতা।

ক্রিপটিক ফেইট

অ্যালবাম কভার- শ্রেষ্ঠ

কিন্তু তখনও আমরা দেখিনি ক্রিপটিক ফেইট আরো কি করার ক্ষমতা রাখে। ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারা ইশা খান দূরে ও বেজবাবা সুমন এর বহুল আলোচিত কম্পাইলেশন অ্যালবাম ছাড়পত্র, অনুশীলন এবং আগুন্তুক সিরিজ ছাড়াও দিনবদল, প্রজন্ম, লোকায়ত কম্পাইলেশন অ্যালবামে নিজেদের গান দিয়ে আরও বেশী মাচিউরড হচ্ছিল। ২০০৫ ও ২০০৬ সালের আগুন্তুক-২ এবং ৩ এ প্রকাশিত দুটি সিঙ্গেল “প্রেম” এবং “অনাদরের সন্তান” দিয়ে অনেক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইংগিত দিচ্ছিল।

ক্রিপটিক ফেইট

দানব অ্যালবামের কভার

যা সবাই বুঝতে পারে ২০০৬ সালে রিলিজ হওয়া বাংলাদেশের এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হেভিমেটাল অ্যালবাম “দানব” এর মাধ্যমে । ফারহান সামাদ ও সারফারাজ এর বিধ্বংসী গিটার রিফ, শ্রেডিং, ফারশেদের ভয়ঙ্কর সুন্দর ড্রামস গ্রুভ, সবসময়ের মতই সাকিবের দানবীয় বেজ গিটারের সাউন্ডের সাথে লাউড ভোকাল ছিল একেবারে পারফেক্ট কম্বিনেশন। প্রতিটা গানের কথাই যেন দুঃখ-কষ্টে ভারাক্রান্ত সংগ্রামী সাধারণ মানুষের মনের কথার প্রতিনিধিত্ব করছিলো। সারা বিশ্বের সাথে সাথে যে অত্যাচার, দুর্নীতি আর অনিয়মের ভাইরাস কিভাবে আমাদের দেশকে প্রতক্ষ ও পরোক্ষভাবে আক্রান্ত করছে সেটা নিয়েও কথা বলেছে তারা।

তবে এই অ্যালবামের সবচাইতে অসাধারন দিক হচ্ছে এখানে যেন মানুষের বিবেকের দুইটি একেবারে বিপরীতধর্মী দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অংশে আহবান, রাগ, অগ্নিবীণা, রনক্লান্তি, ডাকো আমার নাম, দানব গানগুলোতে ক্ষমতার লোভে কিভাবে দিন দিন মানুষ তার নিজ কারেক্টেরিস্টিক্স হারিয়ে দানবে পরিণত হচ্ছে তার একটা স্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর দ্বিতীয় অংশে নিদ্রা, অনুপ্রেরনা, আলোয় বাঁধা রাতের টুকরো ও ইন্সট্রুমেন্টাল ট্র্যাক আশ্রয়-এ যেন শ্রোতাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে এত অসহনীয় এই পৃথিবীর মাঝেও মানুষের একদম ভিতরে আটকে পরা ভালবাসার মত একটি অনবদ্য মানবীয় অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। ‘যাত্রা’ গানটির কথা এই জন্যই আলাদা করে বলবো কারণ ক্রিপটিক ফেইটের পথচলা হয়তো আরেকটু মসৃণ হতো যদি না সেই প্রথম থেকেই তাদের ব্যান্ড মেম্বাররা বাক্তিগত কারনে বিদেশ যাত্রা না করে ব্যান্ডে নিয়মিত সময় দিতেন। যদিও দানব অ্যালবামের লাইনআপই ব্যান্ডটির অরিজিনাল লাইনআপ, তবু বিভিন্ন সময়ে ক্রিপটিক ফেইটে আরও কাজ করেছেন জিবরান (ডেথ রো), রিঙ্কু, আরাফাত কাজি (ওয়াটসন ব্রাদার্স), তুর্য এবং সর্বশেষ অ্যাভয়েডরাফা’র রাফা।

ক্রিপটিক ফেইট

অ্যাভয়েডরাফা’র ফ্রন্টম্যান রাফা যখন ক্রিপটিক ফেইটের ড্রামার ছিলেন, তখনকার একটি প্র্যাকটিস সেশনের ছবি

দানব অ্যালবামের লাউড আর ইম্প্রুভড সাউন্ড, লিরিক্স, মিক্সিং ছাড়াও আরও যে জিনিসটি আলাদা করে চোখে পরেছে সেটা হল বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত দেশীয় ইনস্ট্রুমেন্ট, যেমন তবলা ও হারমোনিয়ামের ব্যবহার- যা ক্রিপটিক ফেইটকে সকল বাঙালি মেটালহেডদের আরও বেশী আপন করে নিয়েছে ব্যান্ডটির সাথে। সব কিছুই আসলে ব্যান্ডটির মাচিউরিটি-ই প্রকাশ করছিল।

দানব অ্যালবামের পর তারা বেশ কিছু কম্পাইলেইশন অ্যালবামে নিজেদের গান দিলেও মুলত মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়টা নিয়ে একটা অ্যালবাম নিয়ে কাজ করছে ক্রিপটিক ফেইট, যার নাম “নয়মাস”। এই অ্যালবামটি বাংলাদেশের সকল সংগীতপ্রেমীদের কাছেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ অ্যালবাম। কারন অনেক ব্যান্ডই আমাদের গৌরবগাঁথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান করলেও ক্রিপটিক ফেইটই একমাত্র ব্যান্ড যারা মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস নিয়েই একটি কন্সেপচুয়াল অ্যালবাম করছে যেখানে প্রাধান্য পাবে পাকিস্তানীদের এদেশের নিরীহ মানুষের উপর কাপুরুষচিত হামলা, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর পাল্টা আক্রমন এবং আমাদের কষ্টার্জিত বিজয় যা আমরা অনলাইনে রিলিজ হওয়া এই অ্যালবামের বেশ কিছু গানে লক্ষ্য করেছি। বহুল প্রত্যাশিত এই অ্যালবামটির কাজ ২০১৩ সালে শেষ হবার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত রিলিজ হয়নি। বিভিন্ন টিভি প্রোগ্রামে সাকিব ভাই আপনি আমাদের অনেক কিছুই বুঝিয়েছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন ক্রিপটিক ফেইটের ফ্যানদের জন্য এবং দেশের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের জন্য এই অ্যালবামটি বের করা খুবই দরকার। অনেক তো অপেক্ষা করলাম আমরা, এবার আশা করি শত বাস্ততার পরেও এই অ্যালবামটি শেষ করবেন আপনারা এই বছরের মধ্যেই, আর “ক্রিপটিক ফেইটের ২০ বছরপূর্তি” উপলক্ষে যে অ্যালবামটি বের করার কথা বলেছিলেন, সেটা একসাথে পেলেও মন্দ হবে না ব্যাপারটা।

ক্রিপটিক ফেইট

“নয়মাস” অ্যালবামটি রিলিজ না হলেও এর প্রতিটি ট্র্যাকের জন্য আলাদা কভার গ্রাফিক্স বের করেছিলো ক্রিপটিক ফেইট

ক্রিপটিক ফেইট আমাদের সবার মনে আরও একটি কারণে পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বানানো সবচেয়ে সেরা কম্পোজিশন- “চলো বাংলাদেশ” এর কারণে যা কিনা বের হয়েছিল তাদের প্রথম কম্পাইলেশন অ্যালবাম ছাড়পত্র’তে। এই জেনারেশনের প্রতিটা ছেলে মেয়ের কাছেই বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের অঘোষিত থিম সং হয়ে উঠে চলো বাংলাদেশ। কিন্তু খারাপ লাগে তখন যখন দেখি একটা প্রতিষ্ঠান “চলো বাংলাদেশ” এই কন্সেপ্টটটা নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়।

আমরা জানি শত বাস্ততার মধ্যে আপনারা গান ও অ্যালবাম বের করে আমাদের এন্টারটেইন করছেন। কিন্তু “ভবঘুরে”, “অনাদরের সন্তান” এর মত গানগুলো এখনো আপনাদের নতুন অ্যালবামের জন্য আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখে। তবে ক্রিপটিক ফেইটের কাছে তাদের ভক্ত ও শ্রোতাদের পক্ষ থেকে আমাদের একটা অনুরোধ থাকবে, সেটা হলো আপনারা যেন আরও অন্তত বিশ বছর আমাদের কে দানবীয় কিছু গান উপহার দিয়ে যান। আর নতুন জেনারেশনের কাছে রিকয়েস্ট হলো ‘Know your metal’!

music-piracy-7-638

আবারও শেষ করবো কিছু দরকারী কথা দিয়ে যা নতুন এবং পুরানো সকল জেনারেশনেরই মাথায় রাখা উচিৎ। যদি আমরা এই ব্যান্ডগুলোকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তাহলে ফ্রি ডাউনলোডের মত সস্তা মানসিকতা বাদ দিতে হবে। মিউজিশিয়ানরা এত কষ্ট করে আমাদের জন্য অ্যালবাম বানাচ্ছেন, লাখ-লাখ কোটি-কোটি মানুষ তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তবে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু কি আমরা তাদের দিতে পারছি? এসব মানুষরা যদিও এইসব নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিয়েছে, তবুও শিক্ষিত হয়েও আমাদের মত শ্রোতা আর ভক্তরা যদি পাইরেসি করে অশিক্ষিতদের মত আচরণ করি, তাহলে ব্যান্ডগুলো আমাদের থেকে মুখ  ফিরিয়ে নিলেও আমাদের কিছু বলার থাকবে না। তাই সামান্য কিছু টাকা দিয়ে অ্যালবামগুলো কিনুন। অথবা তা না হলেও অন্তত অনলাইন থেকে গানগুলো কিনে শোনার চেষ্টা করা উচিৎ আমাদের সবার।

পরের কিস্তিতে হয়তো আমরা অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা করবো। আর লেখকের মতামতের সাথে অনেকে দ্বিমতও পোষণ করতে পারেন। তবে মেটালহেড ব্রাদারহুড এর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এর পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলা কাম্য। (চলবে)

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top