ফ্লাডলাইট

ইংল্যান্ডের বাংলাদেশ সফর ও বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের মধ্যকার ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ইংল্যান্ড

শত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর নিশ্চিত হয়েছে। ২৬শে আগস্ট (ইংল্যান্ড সময় ২৫শে আগস্ট রাত) এক মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ব্যাপারে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এন্ড্রু স্ট্রস জানান,

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর পরিকল্পনা অনুসারেই হবে।

উল্লেখ্য, ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বাংলাদেশের এ সফর অনেক আগেই পরিকল্পিত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি গুলশানে ঘটে যাওয়া জঙ্গি আক্রমনের কারনে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল নিরাপত্তা বিষয়ে সন্দিহান থাকায় এ সফরে অনীহা প্রকাশ করে। এ আক্রমনের আগে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলও নভেম্বরে বাংলাদেশ দলের সফর প্রত্যাখ্যান করে এবং অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ থেকেও নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে। কিন্তু ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা উপদেষ্টা রেগ ডিকেসন, পেশাগত ক্রিকেট সমিতির প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা ডেভিড লেথারডেল এবং ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের কার্যনির্বাহী পরিচালক জন কার সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে মাঠ পরিদর্শন করেন এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিদর্শন শেষ করে দেশে ফেরার পর অনুষ্ঠিতব্য মিটিংয়ে ডিকেসন ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের টেস্ট দলের অধিনায়ক এলিস্টার কুক ও ওয়ানডে দলের অধিনায়ক ইয়ন মর্গানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন। এ ব্যাপারে ই.সি.বি পরিচালক জানান,

খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাচ্ছে। আমরা নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ঠ মূল্যায়ন পেয়েছি, পর্যালোচনা করেছি এবং আমরা সন্তুষ্ট।

ইংল্যান্ড দলের এ সফরের সিদ্ধান্তে বি.সি.বি প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী স্বস্তি প্রকাশ করেন এবং জানান, “আমাদের এ সফরে নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং সর্বোচ্চ মান প্রদর্শন করতে হবে।”

ইংল্যান্ড দলের এ সফর সম্পর্কে বর্তমান প্রবাসী কার্যালয় থেকে সরকারের উপদেশের বিবৃতিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে জঙ্গি আক্রমনের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এবং খেলোয়াড়দের জনাকীর্ণ এলাকায় চলাচল সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
এর আগে এ সফর সম্পর্কে ইংল্যান্ড ওয়ানডে দলের অধিনায়ক ইয়ন মরগান সফরের ব্যাপারে খেলোয়াড়দের ব্যাক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।উল্লেখ্য, ২০০১ সালে রবার্ট ক্রুফট ও এন্ড্রু ক্যাডিক আমেরিকায় ৯/১১ আক্রমণের কারণে ভারত সফর বাতিল করেন।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল আগামী ৩০শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসবে এবং সফররত অবস্থায় তারা তিনটি ওয়ার্মআপ, তিনটি ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলবে এবং ২রা নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ভারত সফরের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে।

তিনটি ওয়ানডে ম্যাচই দিবা-রাত্রি ম্যাচ হিসাবে অনুষ্ঠিত হবে এবং খেলা দুপুর ১টায় শুরু হবে। ১ম ও ২য় ওয়ানডে ঢাকার শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে যথাক্রমে অক্টোবরের ৭ ও ৯ তারিখ অনুষ্ঠিত হবে এবং ৩য় ওয়ানডেটি অক্টোবরের ১২ তারিখ চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। টেস্ট ম্যাচ দুটি যথাক্রমে ২০-২৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ স্টেডিয়াম ও ২৮ অক্টোবর-০১ নভেম্বর ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ এবং ইংল্যান্ড

২০১০ সালে বাংলাদেশ এবং ইংল্যান্ডের মধ্যেকার ওয়ানডে সিরিজে ব্রিস্টলে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় পায় ছবিঃ ক্রিকইনফো

এর আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বিপক্ষে মোট ৪টি সিরিজে অংশগ্রহন করে। এর মধ্যে ২০০৩ সালের ইংল্যান্ড দলের বাংলাদেশ সফরে ইংল্যান্ড দল দুটি টেস্টে বাংলাদেশ দলকে যথাক্রমে ৭ উইকেট ও ৩২৯ রানে হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে জয়ী হয়, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ দলের ইংল্যান্ড সফরে ইংল্যান্ড দল অনুষ্ঠিতব্য দুটি টেস্টে বাংলাদেশ দলকে যথাক্রমে ইনিংস ও ২৬৭ রান এবং ইনিংস ও ২৭ রানে হারিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে,২০১০ সালে ইংল্যান্ড দলের বাংলাদেশ সফরে ইংল্যান্ড দল অনুষ্ঠিতব্য ৩টি ওয়ানডেতে যথাক্রমে ৬ উইকেট, ২ উইকেট ও ৪৫ রানে জয়লাভ করে এবং ৩-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়ী হয় ও অনুষ্ঠিত ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে যথাক্রমে ১৮১ রান ও ৯ উইকেটে দুটি টেস্ট জিতে ২-০ ব্যবধানে সিরিজে জয়লাভ করে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ দলের ২০১০ সালের ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট ও ওয়ানডে দুটি সিরিজই হয়। এ সিরিজগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দল দুই টেস্টের টেস্টের টেস্ট সিরিজে যথাক্রমে ৮ উইকেট এবং ইনিংস ও ৮০ রানের ব্যবধানে হেরে ২-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজে পরাজিত হয়। উল্লেখ্য,এই টেস্ট সিরিজেই ক্রিকেটের তীর্থস্থান লর্ডসে বাংলাদেশী ক্রিকেটার তামিম ইকবাল প্রথম বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসেবে শতক হাঁকান এবং বাংলাদেশী ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন রাজিব প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ৫ উইকেট অর্জন করেন। এই সফরে বাংলাদেশ দল ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের একটি ওয়ানডে সিরিজও খেলে যেখানে ইংল্যান্ড দল ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়। উল্লেখ্য, এ সিরিজেই বাংলাদেশ দল ইংল্যান্ড দলের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে প্রথমবারের মত জয়লাভ করে সিরিজের ২য় ম্যাচে ৫ রানের ব্যবধানে।

বাংলাদেশ ইংল্যান্ড

২০১০ সালের টেস্ট সিরিজে তামিম লর্ডসের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি পান, সেই সাথে শাহদাত হোসেন একই টেস্টেই ৫ উইকেট অর্জন করে লর্ডসের অনারবোর্ডে নাম লেখান

এ দুদল এখন পর্যন্ত মুখোমুখি ৮টি টেস্টে অংশগ্রহন করে যার সবকটিতেই ইংল্যান্ড জয়ী হয়েছে।

টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ অংশগ্রহন করেন মুশফিকুর রহিম (৫টি টেস্ট), ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ অংশগ্রহন করেন ইয়ান বেল(৬টি টেস্ট), বাংলাদেশ দলের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলেন সাকিব আল হাসান (৪টি), ইংল্যান্ডের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলেন মাইকেল ভন(৪টি)।

টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান তামিম ইকবালের(৫০৫ রান), সর্বোচ্চ শতক ও তামিম ইকবালের (২টি), এমনকি সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংসও তামিম ইকবালের (১০৮ রান)। অপরদিকে ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ রান ইয়ান বেলের (৬৩৩ রান), সর্বোচ্চ শতক মার্কাস ট্রেসকোথিকের(৩টি) ও সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত ইনিংস জোনাথান ট্রটের(২২৬ রান)।

বোলিংয়ে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট সাকিব আল হাসানের(১৭টি) ও এক ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেট শাহাদাত হোসেন রাজীবের(৫-৯৮)। অপরদিকে টেস্টে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট ম্যাথু হোগার্ডের ও এক ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেট স্টিভ হার্মিসনের(৫-৩৫)।

২০১৫ এর বিশ্বকাপে রুবেল হোসেনের উইকেট অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয়

২০১৫ এর বিশ্বকাপে রুবেল হোসেনের উইকেট অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হয়

ওয়ানডেতে এ দুদল মুখোমুখি হয় ১৬ বার, যেখান ইংল্যান্ড ১৩ বার ও বাংলাদেশ ৩ বার জয়ী হয় যার মধ্যে ছিল ২০১১ ও ২০১৫ বিশ্বকাপের শ্বাসরুদ্ধকর দুইটি জয়। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান তামিম ইকবালের(২৬৫ রান) ও ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ রান স্ট্রসের(৬১০ রান)। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ শতক যৌথভাবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও তামিম ইকবালের (১টি)। অপরদিকে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ শতক স্ট্রসের (২টি)। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংস তামিম ইকবালের(১২৫ রান) ও ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংস স্ট্রসের (১৫৪ রান)।

ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট এন্ড্রু ফ্লিন্টফের(১২ উইকেট) আর বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হলেন আব্দুর রাজ্জাক (১২ উইকেট)। ইংল্যান্ডের হয়ে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেট পল কলিংউডের(৩১-৬) ও বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেট নেন রুবেল হোসেন(৪-৫৩)। ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ক্রিকেটার হলেন পল কলিংউড(১৪ ম্যাচ) ও বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা(৯ ম্যাচ)। সর্বাধিক অধিনায়কত্ব করেন মাইকেল ভন(৬ ম্যাচ) ও হাবিবুল বাশার(৪ ম্যাচ)।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখন নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল অবস্থায় আছে এবং এই সময়ে এই সিরিজ বাতিল হলে তা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য খুবই ক্ষতিকর হিসেবে প্রমানিত হতো। স্বাগতিক দেশের এমন বৈরী পরিস্থিতির মাঝেও ইংল্যান্ড দলের সফরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই প্রশংসনীয় এবং ক্রিকেটের জন্য মঙ্গলজনক। তাই আশা রইল এই সিরিজের মাধ্যমে জয় হবে ক্রিকেটের, ক্রিকেটারদের, ক্রিকেটপ্রেমীদের।

Most Popular

To Top