নাগরিক কথা

দেশ থেকে ফেরত আসার পরে…

দেশ থেকে ফেরত আসার পরে

দেশ থেকে ফেরত আসার পরে একধরনের হ্যাংওভার কাজ করে। এইখানে লেবু খাইয়া ফ্রেশ ফিল করার কোন উপায় নাই। কি বমি করবা তুমি? স্মৃতি? স্ল্যাং? মায়া? মনে হয় একটা ডিফরেন্ট টাইমে একটা ডিফরেন্ট স্পেইসে ঘুরতে গেছিলাম। অন্য পৃথিবীর কোন জায়গা। সেইখানে ফুলেরা ফুঁসলায় তরুনদের, সেইখানে খুন হয় কফিকাতর লোকেরা। বকধার্মিক ও বকচোদেরা মিলেমিশে থাকে সন্ধ্যার আন্ধারে, চা খায় টঙের দোকানে। আমার মনে হইতো আমি বাদাখশানের শাহজাদা, এই বেদরদী শহরে আমার কেউ নাই। স্ল্যাঙের প্রতি আমার প্রবল আসক্তি, চাটগাঁইয়ারা “চ” ও “ছ” এর একটা মাঝামাঝি বর্ণমালা দিয়া একটা গালি শুরু করে। ডায়াস্পোরার পাবলিকেরা যখন কথা কয়, প্রমিতে কয়। গালি গালাজ নাই, কোন ইনুয়েন্ডো নাই। নিরামিষ। তিন বছর স্ল্যাং না শুনতে শুনতে, ধূলা না খাইতে খাইতে আমার খালি মনে হইতো আমি বাংলা ভুইলা যাইতেছি। রিকশাওয়ালার মুখে যখন প্রথম গালি শুনলাম, মনে হইলো দেশে আসছি। প্রখর রৌদ্রে তার চিনচিনা কন্ঠা থেইকা বাইর হওয়া গালিতে ধপাস কইরা পড়লাম পূর্বদেশে। ছোটবেলায় যার ছবি দেখতাম পাড়ার দেয়ালে, তিনি এখন মেয়র। তৃতীয় বিশ্বের ক্লাসিক্যাল রাজনৈতিক রুপকথা। সংগ্রামী সন্ত্রাসী ছাত্রনেতা থেইকা তরতরায়া নগরপিতা। সাদা কালো থেইকা মাল্টিকালার। ভাল্লাগলো। মাইনষের তরক্কি দেখলে ভাল্লাগে। জ্যাম ধূলার মাঝে হঠাত বৃষ্টি। দুইদিন ঘর থেইকা বাইরাইতে পারিনা। পুরানা বন্ধুরা ক্যালেন্ডারের ছবির মতন। দূর থেইকা সুন্দর। জীবন চিপকায়া রস বাইর কইরা ফেলে তাদের, সময় হয়না। গুলশান হামলা নিয়া কথা বললাম কয়েকজনের সাথে। সব ইন্ডিয়ার দোষ। বাঙালী মুসলমানের চিরকালীন নন্দ ঘোষ। ডিবেইট করতে ইচ্ছা করেনা। কার লাইগা ডিবেইট করবেন? বৃহৎ প্রতিবেশীর দালালদের লাইগা? এই পারভার্শনে তাদের অবদান কম? ভারত মানে এখনো হিন্দুস্তান পূর্ববাংলায়। আর আপনি যখন আবাসিক হোটেলের সামনে দাঁড়ানো সপসপা চুলের টেরিকাটা পিম্পের মতন ভারতের দালালি করবেন, এইটা তার কন্সিকোয়েন্স হবে। পিপল নিড ডিস্ট্যান্ট এনিমি হুম দে ক্যান ব্লেইম ফর এভ্রিথিং। এন্ড ইউ আর প্রভাইডিং দ্যাট টু দেম। আইরনি হইলো, এরাই আবার সারাদিন জি বাংলা আর জাকির নায়েক আর ভারতবিরোধিতা করে। একই বৃন্তে তিন ফুল!!! জাকির ভাই তার মুসলিমনেস দিয়া তার ইন্ডিয়াননেসরে উতরায়া যান, ইন্টারেস্টিং কেইস। আর দেখলাম প্রচুর ফাস্ট ফুড, সেলফি তোলা যায় এমন ফাস্ট ফুড আর শপিং মল। রোজার মাসে শাদ্দাদের বেহেশতের মতন শপিং মলে ধার্মিক মানুষের মজমা। সংযম। কঞ্জিউমারিজম চুইয়া চুইয়া ঢুকতেছে ফিউডাল কাঠামোর ভিত্রে। আমাকে দেখো, আমাকে দেখো, আমাকে দেখো। দেখনদারীর অর্থনীতি আর তার উপজাত হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতি। কমোডিটি ফেটিশিজমের মচ্ছব। এইসবের মাঝখানে সন্ধ্যা সাতটায় পুরানা বন্ধুর মুখ, হঠাত একদিন হুডের ফাঁক দিয়া দেইখা ফেলা আলিঙ্গনকাতর কবুতর যুগল, স্কুল টিচার, পায়ে ধইরা সালাম, আর মহাজনপট্টির ঘুটঘুইট্টা আন্ধার। আগাছার মতন প্রেম জন্মায় এইখানে, সোঁদামাটির ফুলসমেত। হিংস্র সাপ ফিইরা আসে সঙ্গীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে, চশমায় হিল্লোল তুইলা জিগায়, “তুমি যে সেদিন আসলানা?” হাস্নুহেনার বনে সাপেদের হিসহিস… ভাল্লাগে এইসব কলোকিয়াল ক্ষ্যাত ব্যাপার স্যপার। আন্তর্জাতিকতা, কসমোপলিটান চুদুরবুদুর প্যারিসিয়ানরা করতে পারে, নিউইয়র্কাররা পারে, পূর্ব বাংলায় টিকেনা এইসব। কান্ধের মাঝে ঐতিহাসিক রক্তজবার ক্ষত, মিসকিন ক্যাম্নে আন্তর্জাতিক হয় সোনা? আসার সময় কুয়ালালামপুর থেইকা উঠলো একজন পাশের সিটে। ডিপোর্ট করা হচ্ছে তারে। গরীব চেহারা, ষোল-সতের বছর বয়স। নৌকায় আসছিলো, এখন ইলিগ্যাল বইলা ফেরত পাঠানো হইতেছে। জানে ও না কি ঘটতেছে। ঠোঁটের কোনায় সাদা দাগ, বিহবল চোখ। বিশের দশকে এরা শরতবাবুর উপন্যাসে রেঙ্গুন থেইকা মনমোচড়ানো চিঠি লিখতো, ” একবার পথের খরচ জুটাইতে পারিলেই তোমার মুখখানি দেখিয়া আসিবো মা “। এরা আমাদের ভাই, আমার দেশীয় ভাই। গরীব আর মধ্যবিত্ত ভাই হয় ক্যামনে? সত্তর দশকীয় প্রশ্ন হয়ে গেলো বোধহয়। বাদ দেন। ব্যাক করার সময় পাশের সিটে যিনি থাকলেন, তিনি ডাক্তার। ডি এম সি থেইকা পাশ করা, আমার পূর্ব পরিচিত। সত্তর দশকীয় ঋজুতা নিয়া তিনি বললেন, তিনি কোন কমিশন নেননা। ফার্মাসিউটিক্যালস, ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক, কারো থেকে নেন না। বাংলা সিনেমার নায়কেরা এমন ছিলো সত্তর, আশির দশকে। নতুন পাওয়া একটা দেশ যেন নয়া প্রেমিকার মতন। তারে নিয়া কত স্বপ্ন। কত আশা। আর এখন? এখন তিনি কি হিরো? নাকি কমেডিয়ান? এই ২০১৬ সালে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? তীব্র চাবুকের মত দারিদ্র, পেটমোটা মধ্যবিত্ত আর ডিসেন্সিটাইযড বেভুল তরুনদের নিয়া তুমি কোন ফুলবনে যাচ্ছ? আর আমি এই জংলাপাড় ফেইলা কোন আনন্দিত নরকে যাচ্ছি, প্রিয় বাংলাদেশ?

– মূল লেখক এ টি এম গোলাম কিবরিয়ার অনুমতিসাপেক্ষে প্রকাশিত।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top