বিশেষ

বাঙালী বিয়েঃ ব্যাক টু বেসিক

বিয়েশাদি বেসিক নিয়ন আলোয় neonaloy

‘বিয়ে’ শব্দটা শুনতেই যেন আমাদের মনে একটা উৎসব-উৎসব ভাব জেগে ওঠে। একটা বিয়ে মানে দুইজন মানুষ, দুইটি পরিবারের এক হওয়া। সেই সাথে অনেকদিন পর সব আত্মীয়স্বজন,বন্ধু-বান্ধব একসাথে হওয়া, মজা করা, সবাই মিলে সুন্দর কিছু সময় কাটানো আর বিয়ের উৎসব শেষে আনন্দের কিছু স্মৃতি নিয়ে আবার ব্যাস্ত জীবনে ফেরা।

ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামের যুগে ‘বিয়ে’ শব্দটির অর্থ দিনকে দিন যেন অনেক ভারি হয়ে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানের বাজেট মিলাতে না পেরে বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই। বড় হল ভাড়া না পেলেই নয়, এই সুযোগ নিয়ে এক বছর আগে থেকে চলছে হল বুকিং এর ব্যাবসা। কে কত বড় বাজেটের বিয়ে করলো সেটাই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’ এর প্রতিযোগিতায় গা ভাসানোর আগে কেমন ছিল আমাদের বিয়ের উৎসব?

বেশিদূর যেতে হবে না,আমাদের খালা-মামাদের বিয়ের কথাই ধরুন। বাড়িতে একটা বিয়ে মানে সবসময় হুলুস্থুল কাণ্ড। বিয়ের বাজার করা, ঘর সাজানো, মেহমানদারি করা এগুলা ছাড়াও আরও বাহারি কাজ। এইসব আয়োজনে বাড়ির বড় মানুষগুলো সারাক্ষণ দৌড় ঝাঁপের ওপরেই থাকতেন। সেই ফাঁকে মজার সময় কাটাতো বাড়ির ছোটরা। একেকটা বিয়ে ছিল কাজিনদের একেকটা মিলনমেলা। সবার মধ্যে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনা আর বিয়েতে কি কি করা যায় তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা।অনেক আইডিয়া সবার মাথায়,নতুন কিছু করতে হবে।

‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানটি করা হতো পারিবারিকভাবে। ছোট পরিসরে লিভিং রুমে, উঠানে কিংবা ছাদে করা হত স্টেজ । স্টেজটা কেমন হবে তা নিয়ে চলত বিশাল গবেষণা। বড় ভাই এক রকম বলে তো ছোট বোনের তা মনে ধরে না। হলুদের আগের রাতে খুব সিরিয়াস মিটিং করে অনেক আলোচনা আর তর্ক-বিতর্কের পর সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্তে একমত হতো। এদের মধ্যেই যার আঁকার হাত ভালো, তিনি দায়িত্ব নিতেন নকশার ডিটেইল ডিজাইন আঁকার। একেবারে ফুল,কাপড়, দড়ি,সুঁই- সুতার হিসাব সহ। পরদিন ভোরে ফুল কিনতে পারদর্শীরা রওনা দিতেন ফুল কিনে আনতে। এরপর নাওয়া- খাওয়া বাদ দিয়ে সবাই স্টেজ তৈরির কাজে লেগে যেত। সন্ধ্যার আগেই স্টেজ তৈরির কাজ শেষ, আর সাথে সাথেই অনুষ্ঠান শুরু।

 

অপর পক্ষের অল্প কয়জন মেহমান হাজির হত ডালা নিয়ে। তাদের মাথায় ফুল ছিটিয়ে বরণ করা, টুথপিকে লাগানো আঙ্গুর, মিষ্টি খাওয়ানো, প্রত্যেকের হাতে ছোট একটা সুভেনিওর দেয়া – এই অংশেও ছিল নানা সংযোজন। পরিবারের প্রবীণেরা বর বা কনের গায়ে হলুদ ছুঁয়ে, দোয়া করে হাতে রাখি বেঁধে দিতেন । সামনে থাকতো ফল ও মিষ্টি জাতীয় কিছু খাবার। এই খাবারের ডেকোরেশন যেন আরেকটি শিল্পকর্ম। খালা-ফুফুরা কি নিখুঁতভাবেই না আনারসের গায়ে আঙুর দিয়ে কিংবা তরমুজের খোলের মধ্যে নকশা ফুটিয়ে তুলতেন! সবার হলুদ দেওয়া শেষ হলে বাড়িতে তৈরি বিরিয়ানি ছিল রাতের আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে বাড়িতে থেকে যেতেন আরও কিছু আত্মীয়- স্বজন। এরপর রাতভর আড্ডা-গান।

এক-দুইদিন পরেই বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ে বাড়ি কি আল্পনা ছাড়া চেনা যায় ? বড় ভাইদের কাজ ছিলো বিয়ের আগের রাতে বাজার থেকে রঙ-ব্রাশ কিনে আনা। এরপর সেগুলো ভাগাভাগি করে নিত ছোটরা। কয়েকটা নকশা ঠিক করে কাজ শুরু। সিঁড়ি, বারান্দা এমনকি দেয়ালেও ফুটে উঠত নানা নকশা। একরাতেই পুরো বাড়ি যেন বিয়ের রঙে রঙিন। এর মধ্যেই পারদর্শী কেউ বর / কনের হাতে মেহেদি দিয়ে দিতো।

এরপর আসে বিয়ের দিন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সবাই ঝটপট তৈরি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য। বাড়ির বাইরে দাঁড়ানো গাড়িতে রওনা হবে। বিয়ের গাড়ি সাজানোর কাজটা ছোট ভাই- বোন আর বন্ধু- বান্ধবেরা মিলে করে ফেলত। বিয়ের উদ্দেশ্যে এই ভ্রমনের কোন তুলনা হয় না। বাড়ির বয়স্ক থেকে পিচ্চি সবার একসাথে এই যাত্রায় কত আড্ডা-গান-হাসাহাসি। আর ওদিকে কনের বাড়িতে চলছে হুলুস্থুল, বরপক্ষ আসার আগে রান্নাবানা শেষ করা থেকে শুরু করে এটা-সেটা আরো কত কিছু বাকী! কনের বাবার একটাই চিন্তা, বরপক্ষ পৌঁছনোর আগে মনেহয় সব আয়োজন সম্পন্ন করা যাবে না। উত্তেজনায় তিনি একবার একে ধমক দেন, তো আরেকবার ওকে ছাতা হাতে ধাওয়া করেন। কিন্তু এত তর্জন-গর্জনের মধ্যেও নিজের যে মেয়েটাকে এত আয়োজন করে বিদায় দিচ্ছেন, তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস করে উঠতে পারেন না কোন এক ব্যাখ্যাতীত বেদনায়।

বরপক্ষ কনের বাড়ি/ কমিউনিটি সেন্টারে পা রাখতেই ব্যাপক সমাদর। বিয়ের প্রধান অংশ পরিচালনার পাশাপাশি একই সাথে চলে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া। প্রত্যেক ৪/৫ জনের পিছে একজন লেগেই থাকতো বার বার প্লেট ভরে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য। গলা পর্যন্ত না খাওয়া হলে রেহাই নাই।

এখন গল্পের মত মনে হলেও এগুলোই আমাদের স্বাভাবিক ও সুন্দর রীতি। বর্তমানে খুব কম অনুষ্ঠানেই এ নিজস্বতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। নতুন কিছু চিন্তা করে কিভাবে অনুষ্ঠানগুলোকে একটু অন্যরকম করা যায় – এই চর্চাটা যেন একেবারেই কমে যাচ্ছে। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই হাজারটা ষ্টেজের ডিজাইন। পছন্দ হল- টাকা দিলাম- হয়ে গেলো। একই ডিজাইনের স্টেজে বিয়ে হচ্ছে ১০ টা। ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও বলতে হয় একই রকম। ফটোগ্রাফার ইউনিক কিছু করতে চাইলেও তাতে সায় নেই বর-কনের। হুবুহু একই পোজের ছবি দেখা যায় প্রায় সবগুলো বিয়ের অ্যালবামে।

হলুদে নাচ এখন এতটাই মুখ্য যে অন্য কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে রাজি নয় কেউ। নাচের প্রভাবে মলিন হয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের অন্যান্য সব অংশ। এই সব লোক দেখানো অনুষ্ঠানের ভিড়ে আন্তরিকতা ব্যাপারটা হারিয়ে গিয়েছে অনেকখানি । সবাই যেন একটা লোক-দেখানোর লুপের মধ্যে আটকে পড়েছে।

এর পিছনে অনেক কারন আছে। কমন কারন ‘ব্যাস্ততা’। সবাই ব্যাস্ত, কারও সময় নেই। আর পারিবারিক বন্ধনগুলো কি আর এখন আগের মতন আছে ? হ্যাঁ, আগের মত হয়তো নেই, কিন্তু যেটুকু আছে আসুন সেটাকে প্রাধান্য দেই। জমকালো অনুষ্ঠানের দিকে মন না দিয়ে মন দেই কাছের মানুষগুলোর দিকে। প্রাধান্য দেই পরিবারের বয়স্কদের, পুরানো বন্ধুদের আর নতুন যুক্ত হতে যাওয়া পরিবারটিকে। দায়িত্বগুলো নিজেরা ভাগাভাগি করে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে আরও কাছাকাছি আসি। বিয়ের এ সংস্কৃতিতে নতুনকে গ্রহণ করতে গিয়ে এর সুন্দর অতীত যেন মুছে না যায়। picture perfect wedding competition থেকে বের হয়ে আয়োজনের সময়টুকু সবাই মিলে উপভোগ করি। একটি বিয়ের সাথে যেন কাছের মানুষগুলোর অনেকগুলো সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ
অভিজিত নন্দী
আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ -দোলন
অরেঞ্জ ভিজুয়ালস
স্টোরীবক্স 360 (কভার ফটো)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top