নাগরিক কথা

ফসিলস বনাম মাইলসঃ যে বিষয়গুলো এড়িয়ে একপাক্ষিক বিশ্লেষণ করলে ভুল করবেন

কোন কালচারাল একটিভিস্টকে মারামারি করতে দেখলে আমি বড়ই বিরক্ত হই। যাদের গান গুনগুন করে গেয়ে, যাদের লেখা পড়ে মন ভালো থাকে এরা আমাদের মত গালাগালি করছেন, ব্লেইম গেইম খেলছেন- দেখতে ভালো লাগেনা। সুমন ভাই বনাম এবি, মাইলস বনাম এবি সবই খুব বিরক্তির ব্যাপার।

যে কোন কিছুতেই তো আমরা পলিটিক্যাল বেসিসে দুইভাগ হয়ে আগেই একটা তালগাছ ধরি (পক্ষ ঠিক করে), তারপরে দরকার পড়লে বুলশিট কথাবার্তা বলে হলেও তালগাছ বাঁচানোর চেষ্টা করি, তাই অনেকের অনেক আজাইরা কথাবার্তা চোখে পড়ছে। এইজন্যই মোটামুটি নির্মোহভাবে কিছু ফ্যাক্ট তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। আমি শাফিন আহমেদের, রুপম ইসলামের দুইপাশের ভিডিওই দেখেছি, শেয়ার করেছি। পুরা ঘটনার ফ্ল্যাশব্যাক নিয়ে একটা ইনফরমেটিভ সাক্ষাৎকার ভিডিও দেখেছি। বাকী জিনিসপত্র বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে নিজেই দেখেছি।

১) মাইলস/রূপম ইসলাম কেউই কারো মিউজিক ক্যাপাবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেনাই। ইস্যু কে কার থেকে ভালো গান গায় এইটা না। সুতরাং ফসিলস কে? রুপম ইসলাম ফেইমের জন্য এমন করছে এই টাইপ কথাবার্তা আসলে ইচ্ছা করে আসল ইস্যুকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছু না। কারণ তারা জানে শাফিন-হামিন ভাতৃদ্বয় ধোয়া তুলসীপাতা না।
২) শাফিন আহমেদ তার ভিডিওতে খুব চমৎকারভাবে কালচারাল এক্সচেঞ্জের কথা বলেছেন। শুনে মন জুড়িয়ে গেছে।

Miles to Fossils. Kolkata Azaadi ConcertWe were compelled to give a short statement about BOYCOTT MILES campaign run by Kolkata band Fossils.

Posted by Miles on Wednesday, August 3, 2016

এবং সাথে সাথেই মনে পড়েছে উনি অথবা হামিন আহমেদ একটা পেজের স্ট্যাটাস শেয়ার করেছিলেন। সেখানে ভারতীয় শিল্পীদের এদেশে পারফর্ম করা ঠেকানোর জন্য বিদ্রোহমার্কা ডাক দেয়া হয়েছিলো। পাবলিক মিডিয়াতেই উনি একবার বলেন ভারতীয় পারফর্মার ঠেকানো হবে আবার বলেন কালচারাল এক্সচেঞ্জের কথা। আসেন একটু গলা মিলাইয়া কান্দি!
৩) যেই পেইজটার কথা বলা হচ্ছে সেটার নাম হচ্ছে বাংলাদেশীজমনাহিদ হেলাল নামের একটা বাটপার এই প্রজেক্ট চালায়। উনার সাথে আরিফ আর হোসাইনের একটা ব্যাপারে খুব মিল। দুইজনেই দেশপ্রেম দিয়ে পুরা রুটি হালুয়া একাকার করে ফেলে এবং আপনি উনাদের ব্যাপারে একটা কাশি দিলেও ব্লক খাবেন (আমি দুইজনের প্রোফাইলেই ব্লকড, বলবেন না আবার যে উনাদের ইউজ করে হিট হচ্ছি)। এই পেইজ এখন একদম কোমড় বেধে দেশপ্রেম ফেরি করে রুপম ইসলামকে নিয়ে নেগেটিভ নিউজ করছে একপেশে ভাবে। দেশপ্রেম কিনা!!!
৪) দেশপ্রেমের কথা অবশ্য শাফিন আহমেদও বলেছেন। উনি অন্য দেশকে ক্যাপিটাল অফ রেপ, পতাকা কমোডে ফ্লাশ, সোয়াইন ফ্লু, *** আপ কান্ট্রি বলে গালাগালি করে নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন। অন্য দেশকে গালাগালি করে কিভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যায় আমার বুঝে আসেনা। তাই আমি নিজেও ইদানীং আর পাকিস্তানের নাম বিকৃত করিনা। অন্য দেশকে গালি না দেয়ার চেষ্টা করি। মাঝেমাঝে চলে আসে, কন্ট্রোলের চেষ্টা করছি। কারণ পাকিস্তানেরই একটা অংশের ইয়াং জেনারেশন মনে করে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তাদের মনে কষ্ট দিতে চাইনা। অন্যান্য দেশের ব্যাপারেও সেইম কথা।
৫) আমার দেশ নিয়ে বাজে কথা বললে আমার খারাপ লাগবেই। আমি মেটালিকার পাগল ফ্যান। হেটফিল্ড সাহেবও যদি শাফিন-হামিন ভাতৃদ্বয়ের মত ভাষায় আমার দেশ নিয়ে কথা বলে, এবং কখনো মেটালিকা বাংলাদেশে কনসার্ট করার দাওয়াত পেয়ে আসে, নগদে তার বিরোধিতা করবো।
৬) এই মুহূর্তে আপনার মনে প্রশ্ন জেগেছে, রুপম ইসলাম তো বাংলাদেশকে নব্য পাকিস্তান বলেছে। পেছনের ঘটনা কি জানেন? বিশ্বকাপের সময় তার পেইজে বাংলাদেশের লোকজন গিয়ে গালাগালি করে আসছে, মুসলমান হয়ে কিভাবে ইন্ডিয়ায় থাকে এই ডায়লগ মেরে আসছে। সে চুপ ছিলো। মাইলসের একজন মেম্বার তার বউয়ের একটা স্ট্যাটাস শেয়ার দিয়ে ক্যাপশন দিয়েছে বিচ প্লিজ। এরপরেই সে ফেসবুকে এর প্রতিবাদ করেছিলো। এই যে এইরকম ব্যাবহারগুলি কারা করে? খুব সিম্পল এনসার। সাকিব আল হাসানের পেইজে কমেন্টগুলি পড়েন। এরা চটি পেইজে লাইক দিয়ে, সারারাত পর্ণ দেখে, ফেসবুকে গালাগালি করে আবার ধর্মের বয়ান দেয়। এবং এরা সবাই পাকিস্তান বলতে অজ্ঞান। লাগবেন বাজী? গিয়ে চেক করেন। আমাদের দেশকে যে কিছু মানুষ পাকিস্তানের মত অস্থিতিশীল বানাতে চায় এটা কি অস্বীকার করেন? ওই মানুষগুলি ছাড়া কেউই এটা অস্বীকার করবে না। হ্যাঁ, এটা শুনতে খারাপ লাগে। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা না কথাটা। ওকে, রুপম ইসলামের কথাটা ছিলো অনেকটা এরকম, ‘একটা নব্য পাকিস্তান দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশে’- কথাটা কি ভুল?
৭) আমি রুপম ইসলামকে ডিফেন্ড করছিনা। হামিন-শাফিন ভাতৃদ্বয়ের তুলনায় ও কিছুই করেনাই যে ডিফেন্ড করতে হবে। বাই দ্যা ওয়ে, সে ক্ষমাও চেয়েছিলো এইটা মনে হয় জানেন না। তার বক্তব্য দেখে আসতে পারেন নিচেই। 

Aamar shikkhagoto jogyota!Aamar shikkhagoto jogyota!

Posted by Rupam Islam on Thursday, August 4, 2016

আরো ক্ল্যারিফিকেশন আছে মনে করলে দেখে আসতে পারেন এই ভিডিও-টিও!

৮) মাইলসকে পারফর্ম করতে দেবেনা কলকাতাতে, এটাতে ওখানকার ভক্তদেরও ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বিইং অনেস্ট, আমার দেশের স্বাধীনতা দিবসে আমিও অন্যদেশের সেই লোককে বাজাতে দেখতে চাইবোনা যে উগ্রভাবে আমার দেশকে হেইট করে পাবলিক মিডিয়াতে।
৯) মাইলসের কিছু আসে যায় নাকি এটা বলার আগে একটা জিনিস ক্লিয়ার হওয়া দরকার। আমাদের দেশের কোন চ্যানেল ইন্ডিয়াতে দেখায় না। বাজার তৈরী করতে পারলে দেখাবে। বাজার কিন্তু কালচারাল একটিভিস্টরাই তৈরী করতে পারে। কোন পলিটিক্যাল প্রেশার পারেনা। বাংলাদেশের দশটা ব্যান্ড ইন্ডিয়াতে গিয়ে শো করে যদি সাড়া ফেলতে পারে তাহলেই বাংলাদেশের গানবাংলা চ্যানেলকে হয়তো ওরা সম্প্রচার করতে চাইবে। এগুলি সিম্পল ম্যাথ। আমাদের দেশে ইন্ডিয়ার পণ্যের বিশাল বাজার। উঠতে বসতে গালি দিলেও এটা সত্যি কথা। কালচারাল এক্সচেঞ্জ দরকার। আমাদের আরও বেশী দরকার। নাহলে, খালি ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখায় কেনু বলে চিল্লায়া লাভ নাই। দেশের অর্ধেক সিনেমা হয় ইন্ডিয়ার নকল। অস্বীকার করতে পারবেন? আমাদের রক মিউজিক সিনারিও এই সাইডে অনেক কোয়ালিটিফুল। বাজার ধরতে হলে বাজারকে সম্মান করতে হয়। ধুর **লামনা বলে সমস্যার সমাধান হয়না।

১০) সর্বশেষঃ হামিন-শাফিন মানেই মাইলস না। মাইলস একটা ব্যান্ড। মানুষ বলেনা শাফিনের গান শুনি। বলে মাইলসের গান শুনি। মাইলসে ইকবাল আসিফ জুয়েল ভাইও গিটার বাজায়। যে গণজাগরণ মঞ্চের সময় “মার্চ টুয়ার্ডস দা সান” প্রোগ্রামটার অন্যতম উদ্যোক্তা।

যা দেখে পরবর্তীতে একইরকম সচেতনতামূলক উদ্যোগ ছড়িয়ে পরেছিলো ঢাকার বাইরে দেশের অন্যান্য অংশেও!

এই পোস্টেই সবগুলো প্রাসঙ্গিক ভিডিওর লিংক দিলাম। দেখেন, জানেন, তারপরে জাজ করেন। আমি নিজের দেশের হইলেই একটা রাজাকারের সাপোরটারকে সাধু বানিয়ে সাপোর্ট করতে রাজী না। আমি বরং কলকাতার ওইসব ইয়াংদের থেকে শিক্ষা নিলাম কিভাবে দেশকে সম্মান দিতে হয়। আমি যাকে ২৪ ঘণ্টা গালি দেই, তার বিয়ার প্রোগ্রামে আমি নিশ্চয়ই নাচ দেখাতে যাবোনা, দাওয়াত পাইলেও না। হামিন-শাফিন ভাতৃদ্বয় যা ডিজারভ করেন, তা-ই পেয়েছেন। কিন্তু অহেতুক অন্যরাও অপমানিত হলো, এটাই আফসোস। কিন্তু এটার সাথে সাধারণ গানপাগল মানুষদের অথবা মিউজিকের সম্পর্ক নাই। একজন প্রফেশনালকে খুব দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হয়, বিশেষ করে যখন তিনি নিজের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করার সুযোগ পান তার প্রফেশনের খাতিরে। নিজের ছেলে চোর হয়ে গেলে “তাকে” শাসন করতে হয়। অন্যকে নিয়ে টানাটানি করলে চোর একসময় ডাকাত হয়ে যায়।
আমি চাই বাংলাদেশের ব্যান্ডগুলা, অন্য আর্টিস্টরা বেশী করে অন্য দেশে পারফর্ম করুক। বাজার তৈরী হোক। বাংলা চ্যানেলগুলি ওইখানে টেলিকাস্ট হোক, গানের সিডি বিক্রি হোক। তালগাছের মালিকদের গাছে তাল ধরুক, গুড় হোক।

* জামাতপন্থী লোকজন ভারতের দালাল বলতে চাইলে ওয়েলকাম। আমি জানি আপনাদের কাছে আপনার তালগাছটা আছে। আপনি এক চোখ জোর করে বন্ধ রাখতে চাইলেও আমি পারিনা। ফেসবুকের পেইজগুলিতে দুই দেশের লোকজনই গালির খাতায় স্বরলিপি খুলে রেখেছে। এইটা আলাদা করে দেখানোর কিছু নাই। কাটাকাটি।
অপেক্ষায় আছি কখন উনারা বলবেন, সুন্দরবন ইস্যু ধামাচাপা দিতে এইটা সরকারের নাটক!

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top