নিসর্গ

মহাসাগরের বুকে এক রহস্যময় নিঃসঙ্গ তিমি

ওর ডাকনাম দেওয়া হয়েছে নিঃসঙ্গ তিমি (The lonely whale)।  প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ঘুরে বেড়ানো এই তিমি এমনই এক গান গায় যা আর কার মতই নয়। কেও কেও বলে, তার গান শুধুমাত্র কোন গান নয়, এই বিশাল মহাসাগর জুড়ে সঙ্গির খোঁজে কান্না, যা সে আজো খুঁজে পায় নি। কেও নিশ্চিত ভাবে জানে না এই নিঃসঙ্গ তিমি স্ত্রী না পুরুষ? কোন প্রজাতি? অথবা সে এখনো বেঁচে আছে কিনা??? তার গান সর্বশেষ রেকর্ড করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এই নিঃসঙ্গ তিমি ঘিরে এই গল্পটিই এখন প্রানীজগতের অন্যতম এক বিশাল রহস্য।

গল্পের শুরু ১৯৮৯ সালে। প্রশান্ত মহাসাগরে স্থাপিত ইউ এস নেভির হাইড্রোফোন SOSUS  এ কিছু অদ্ভুত সিগন্যাল ধরা পড়ে, যেগুলো মূলত তিমির সঙ্গীত, বিশেষ করে নীলতিমি। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ছিল পুরোপুরি ব্যাতিক্রম।

 

গানটির মুল নোট ছিল ৫২ হার্জ (52 Hz)  ফ্রিকোয়েন্সির, যা মানবকর্ণের জন্য স্বল্পমাত্রার হলেও নীল তিমির (10Hz থেকে 40Hz) জন্য বেশ উঁচু। ফিন তিমি বা অন্যান্য তিমি যারা ২০ হার্জ এর মধ্যেই গান করে সবার থেকেই এই গান ভিন্ন। ইউ এস নেভির এই রহস্যময় রেকর্ডিং এর গুরুত্ব প্রথম অনুধাবন করতে পারেন  বিল ওয়াটকিন্স ( Bill Watkins) Woods Hole  Oceanographic Institution অথবা WHOI এর একজন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী বিশেষজ্ঞ। তখন থেকেই তিনি এই রহস্যময় প্রানীর গান রেকর্ড করতে শুরু করেন এবং ক্রমশ এটি তাঁর প্যাশনে পরিণত হয়।

 

 

ওয়াটকিন্স (Watkins) ২০০৪ সালে ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি একটি পেপারের কাজ সম্পন্ন করেন যেখানে ১২ বছর ধরে এই তিমির গানের রেকর্ডিং অন্তর্ভুক্ত আছে। পরবর্তীতে তাঁর এই ব্যাপক ও সুক্ষ কাজ বিজ্ঞানিদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তারা দেখেন এই নিঃসঙ্গ তিমি ৫২ হার্জ শুধু রহস্যময়ই নয়,এটি একক এবং অনন্য। ওয়াটকিন এর  মতে, “এটি মেনে নেয়া কঠিন যে বিশাল সামুদ্রিক পৃথিবীতে এই জাতের তিমি শুধু একটিই আছে। বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা দেখেছি এই বৈশিষ্টের গান শুধু একটিই খুঁজে পাওয়া গেছে এবং প্রতি সিজনে শুধু একটি উৎস থেকেই এই গান আসে”।

ওয়াটকিন্স এর গবেষণা এবং নেভির এই নথিপত্র প্রকাশিত হলে বিজ্ঞানিদের মাঝে তা সাড়া ফেলে দেয় এবং ক্রমশ এক রহস্যগল্পে পরিনত হয়। জনপ্রিয় পত্রিকা এবং সামাজিক গণমাধ্যমগুলো একে ‘নিঃসঙ্গ তিমির গল্প” বলে অভিহিত করে। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড “দ্য এক্সপ্রেস” এই তিমির গান কে উল্লেখ করে “একাকীত্বের বিষণ্ণ ক্রন্দন”।

পরবর্তীতে, ২০১৪ সালে আমেরিকান নির্মাতা  জোশ জেমেন (Josh Zemen) এবং অভিনেতা আদ্রিয়ান গ্রেনিয়ার (Adrian Grenier) এই তিমিকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। বর্তমানে এই ফিল্মের জন্য পাব্লিক ফান্ড সংগ্রহ করা হচ্ছে। অস্কারজয়ী অভিনেতা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর দাতব্য সংস্থা ক্যাপ্রিও ফাউন্ডেশন এই পরিকল্পনার সাথেই আছে ৫০০০০ ইউ এস ডলার সাহায্য দান এবং এই প্রজেক্টের লক্ষ্যমাত্রা ৩০০০০০ ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে। আশা করা হচ্ছে এই বছরেই ৫২ হার্জকে খুঁজে বের করে ফিল্মড করা হবে। তবে এই ডকুমেন্টরি নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ৫২ হার্জকে খুঁজে বের করা। এই নিচু ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ সমুদ্রবক্ষে তাদের উৎস থেকে শত শত মাইল, কিছুক্ষেত্রে হাজার মাইল ও পরিভ্রমন করে। ৫২ হার্জকে খুঁজে বের করা তাই অনেকটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতই।

নীল তিমি

নিঃসঙ্গ তিমি

কিন্তু জেমেন এর এটি ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। কিছু তিমি বিশেষজ্ঞ এই পুরো গবেষণা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। এদের একজন Cristopher Wills Clarck  (Cornell University in Ithaca, New York). Clarck  ১৯৯৩ সালে ৫২ হার্জ এর গান রেকর্ড করেন এবং তাঁর মতে, এই তিমি পুরপুরি আলাদা নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এক এক অঞ্চলের তিমি একেক ভাবে গান গায়, এই বিবেচনায় ৫২ হার্জ পুরোপুরি আলাদা নাও হতে পারে। অন্য তিমিরা ৫২ হার্জ এর গান শুনতে পায় না, এই ব্যাপারেও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি ধারনা করেন অন্যান্য তিমিরাও ৫২ হার্জ এর গান শুনতে পায় ,৫২ হার্জ শুধুমাত্র একটু ব্যাতিক্রম গানই করে।

এছাড়াও জন হিল্ডেব্রান্ড ( John Hildebrand,  Institution  of Oceanography in California)  নামের একজন বিজ্ঞানির গবেষনা মতে ১৯৬০ সাল থেকেই নীল তিমিরা ক্রমশ নিচু ফ্রিকোয়েন্সির গান তৈরী করছে। কিছুক্ষেত্রে এই ফ্রিকয়েন্সি পরিবর্তন বেশ নাটকীয়। তিনি দেখান যে, নীল তিমিরা গভীর থেকে গভীর ফ্রিকোয়েন্সি তৈরির জন্য পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে। একটি তিমির সামনে যখন অন্য তিমি ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির গান গায়, তখন সেই তিমিও অপরটিকে অনুকরণ করে নিজের ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিবর্তন আনে।

কিন্তু এই গবেষনাই আবার অন্য একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি সব তিমিই একি গান গাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হয় তবে কেন শুধুমাত্র একজনই আলাদা গান গায়?

এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রচলিত হাইপোথিসিস হল, ৫২ হার্জ একজন হাইব্রিড, দুটো ভিন্ন জাতের তিমির সংকর। এর ফলে  এই তিমির শরীর ভিন্ন রকম যা তার অন্য রকম গানের একটি কারণ। এছাড়া ৫২ হার্জ এর ব্যবহার ও অনেকটাই নীলতিমির মত।  ইউনিভাসিটি অফ ওয়াশিংটন ( University of Washington) এর তিমি বিশেষজ্ঞ কেট স্টাফোর্ড ( Kate Stafford ) এর ভাষ্যে, “৫২ হার্জ এর সিজনালিটি এবং মাইগ্রেটরি প্যাটার্ন অনেকটাই নীলতিমির মত, তাই আমি নিশ্চিত এই তিমির অন্তত কিছু অংশ হলেও নীলতিমির”।

অন্যদিকে এতকিছুর পরেও এখনো কোনও বিজ্ঞানি হাইব্রিড কোন তিমির গান সনাক্ত করতে পারেন নি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল কখন কোন তিমি ডাকছে তা বের করা। এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন  WHOI  এর মেরিন বায়োলজিস্ট মার্ক বুমগারটনার  ( Mark Baumgartner) এমন একটি লিসেনিং সিস্টেম ডেভেলপ করেন যা সবয়ংক্রিয়ভাবে ডাটা এনালাইজ করে এবং রিয়েল টাইমে তা ডিজিটালি প্রকাশ করে। ফলে এই লিসেনিং সিস্টেম সমুদ্রের নিচে স্তন্যপায়িদের শব্দ রেকর্ড এবং প্রজাতিভেদে তা শ্রেণীবিন্যাস করতে পারে। এই ধরনের ডিটেকশন মেথডে নির্দিষ্ট একটি প্রানিকে শনাক্ত করা সম্ভব। বুমগারটনার বলেন, “এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনি ৫২ হার্জকে শনাক্ত করত পারবেন। এজন্য আপনাকে এটিকে এমন জায়গায় স্থাপন করতে হবে যেখানে এই রহস্যময় তিমিকে আগে শোনা গিয়েছিল, যেমন উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকুল”।

এতসব মিলিয়ন ডলার প্রযুক্তি আমাদের একটি কথা জানার জন্যি তৈরি, কি চলছে এই বুদ্ধিমান প্রানির মাথার ভেতরে???৫২ হার্জ হতে পারে একজন একলা তিমি যেমনটা জেমেন মনে করেন, আবার অন্যটির সম্ভাবনা যে নেই তাও নয়।

মূলত, মানুষ ভেবে নেয় অন্যান্য উন্নত প্রানিকুল ও আমাদের মতই আবেগ অনুভব করে। বুদ্ধিমান তিমিরাও আমাদের মত একাকীত্ব অনুভব করে এই আইডিয়াটিই তিমিদের আর আমাদের অনেকটাই আপন করে দেয়। কিন্তু যতদিন বৈজ্ঞানিক সত্য পাওয়া না যায়, এটি মানব মনের একটি ফ্যান্টাসিই রয়ে যাবে। আর এই বৈজ্ঞানিক সত্য খুঁজে বের করার একটিই উপায়, ৫২ হার্জকে খুঁজে বের করা।

সাম্প্রতিক সময়ে হিল্ডেব্রান্ড এর অধীনে একটি দল ৫২ কে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায়। দলের একজন শিক্ষানবীশ ক্যালিফোর্নিয়া উপকুলের সেন্সরে ওয়াটকিন্স এর রেকর্ডিং প্যাটার্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু ডাক ধারণ করে। হিল্ডেব্রান্ড এর ভাষ্যে, “ আমরা আমাদের অফিস থেকে ৬ মাইল দূরেই এই শব্দের উৎসের অবস্থান শনাক্ত করেছি, আমরা মনে করি আমরা ওদের পাবো এবং আমরাই এই রহস্যের সমাধান করব”। হিল্ডেব্রান্ড এর ডাটা থেকে আরও ধারণা পাওয়া যায় একের অধিক প্রানি এই ব্যাতিক্রম ফ্রিকোয়েন্সিতে গান গাইছে। তাই হিল্ডেব্রান্ড এর মতে এই রহস্যময় প্রানি একা নয়, অনেকেই। আর৫২ হার্জকে সেই দলেরই একজন যে খামখেয়ালি হয়ে মাঝে মাঝেই একা ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ে।

যদি তাই হয় তবে এই গল্পের সমাপ্তিও একটি হ্যাপি এন্ডিং, ‘৫২ হার্জ কি একা নয় শেষ পর্যন্ত’। এই কংক্রিট সত্য খুঁজে বের করা কঠিন। তারপরও অনেকেই চিত্রপরিচালক থেকে বিজ্ঞানি সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছে এই নিঃসঙ্গ তিমি ৫২ হার্জকে। তার প্রকৃত সত্য জানার জন্য আমরা শুধু অপেক্ষা করতে পারি, আর শুনতে পারি আবার কখন সে গেয়ে উঠবে।

 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top