শিল্প ও সংস্কৃতি

বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড সিনারিও’র পুনর্জন্মের “ব্লু-প্রিন্ট” [অ্যালবাম রিভিউ]

বাংলাদেশের যে কোন সময়কালের যেকোন একটি  প্রজন্মের চিন্তা চেতনাকে যদি আপনি সে সময়কার শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে খুঁজে পেতে চান, তাহলে আপনাকে যেটা করতে হবে- সেটা হলো সে সময়ে বের হওয়া ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবামগুলো শুনতে হবে। আর সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশী তারুণ্যের চিন্তাভাবনা কিংবা চিন্তাভাবনার আলোড়ন আর অস্থিরতাকে যেভাবে এক মোড়কে বন্দী করতে পেরেছে গত ঈদের রিলিজ পাওয়া মিক্সড অ্যালবাম ব্লু-প্রিন্ট, সেটা সমসাময়িক পারস্পেক্টিভে বেশ ভালো পরিমাণে প্রশংসার দাবী রাখে। অসাধারণ কিছু কম্পোজিশন, পুরোপুরি নতুন কিছু শব্দ, সেসব শব্দের পিছনের কারিগর একদম নতুন কিছু মানুষ, তাদের নতুন কিছু চিন্তা- সব মিলিয়ে ব্লু-প্রিন্টকে বলা যায় ইদানীংকালে বের হওয়া অন্যতম সেরা রক কম্পাইলেশন অ্যালবাম।

বাজারে বের হওয়া শত-শত অ্যালবামের মধ্যে ব্লু-প্রিন্টের কেন এত প্রশংসা? কেননা, এই অ্যালবামটায় অনেকদিন পর দেখা গেছে মিক্সড অ্যালবাম হিট করানোর শিউর-শট কমার্শিয়াল ফর্মুলা থেকে বের হয়ে এসে কিছু ভাল গানকে তুলে ধরার দুঃসাহস। শুধু তা-ই নয়, অ্যালবামে যেই ব্যান্ডগুলোর গান জায়গা করে নিয়েছে, তাদের মধ্যেও ছিলো “বড় ভাই” ব্যান্ডগুলোর অন্ধ অনুকরণ না করে নিজেদের ভিতরের শব্দগুলোকে বাস্তবজগতে নিয়ে আসার প্রয়াস।

আমরা বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের অনেক দিক পরিবর্তন অবলোকন করেছি। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি দিস ইজ দা থিং। এই অ্যালবামের প্রতিটা ব্যান্ডই প্রথম সারিতে উঠে আসার ক্ষমতা রাখে।  যেই কারণে এই অ্যালবামটি খুব সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতেই আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড সিনারিও’তে একটা মাইলফলক হিসাবেই পরিচিত হয়ে থাকবে।

একটা একটা করে যদি এই মিক্সড অ্যালবামের সব ব্যান্ডের কথা বলতে চাই, তাহলে প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই অ্যালবামে গ্রাঞ্জ রক, সাইকাডেলিক রক, এক্সপেরিমেন্টাল রক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তাই এই কথাগুলো বার বার উঠে আসতে পারে।

ব্লু-প্রিন্ট

লিকুইড ষ্টেট ড্রাইভ

ট্র্যাকলিস্টের সিরিয়ালের বাইরে গিয়ে লিকুইড স্টেট ড্রাইভ (এল এস ডি) এর অন্ধতন্ত্র দিয়ে শুরু করি। এক কথায় যদি বলতে চাই, তাহলে বলতে হবে “অসাধারণ”। পাঙ্ক এবং গ্রাঞ্জের অপূর্ব সম্মিলন।

” আমাদের দুঃখ দেখে তোর সব দাঁড়িয়ে যায়! “

ব্লু-প্রিন্ট

দি ম্যানেজার

ভোকালের এই স্টেটমেন্ট দিয়ে গান শুরু হবার পর লিরিকের গভীরতা চোখে পরার মত। গিটারের টোনের র’ সাউন্ড আর ড্রামস এবং বেজের সিম্পল গ্রুভ এই ব্যান্ডকে পিউর সিয়াটল সাউন্ডের ফ্লেভার দিয়েছে। আশা করি সামনে তারা আরও ভালো কিছু করবে, তা না হলে সেটা হবে অসাধারণ সম্ভাবনার নিদারুণ অপচয়।

এরপর বলব দি ম্যানেজারের  ‘কাচ ভাঙ্গা হাসি শুনে’ ট্র্যাকটির কথা। এই গানটি শুনে কেউ যদি বলে তারা ওল্ড পার্ল জ্যাম শুনছে – তাহলে অবাক হব না। এক্সট্রা লো বেজ সাউন্ড আর হাই পিচ ভোকাল তাদের গানকে আরও বেশি পরিপূর্ণতা দিয়েছে। আমার মনে হয় তাদের এই গান শুনে “কে এই ম্যানেজার?” প্রশ্নটা আরও বেশি ঘুরপাক খাবে সবার মনে। সেটা হলে অনেক ভালই হবে।

এরপর একটা অদ্ভুত সুন্দর পোস্ট সাইকেডেলিক/আর্ট রক গান এর কথা বলব, যেটা হল মন্দ্র ব্যান্ডের ইন মন্দ্র। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক নতুন কনসেপ্ট, তাদের প্রচেষ্টা অনেক প্রশংসনীয়। অদ্ভুত সুন্দর গিটার কম্পোজিশন, কমপ্যাক্ট ড্রামিং কম্পোজিশন অবশ্যই তাদের আরও ভাল দিক। এই ট্র্যাকটি শোনার পর অবশ্যই শ্রোতারা এখন তাদের নিজস্ব এলবাম “চিত্রকর” এর উপর অনেক আশা রাখবে ।

ব্লু-প্রিন্ট

নাইভ

এ্যালবামের একমাত্র ইংলিশ নাম্বার নাইভ-এর ‘ইন্যাক্টিভ’ গানটিতে রিফ্রেশিং একটা ব্যাপার আছে। আর সাথে নু মেটালের প্রভাবটাও লক্ষ্যনীয়।

যদি কেউ হারিয়ে যেতে চান, তাহলে বলব লেভেল ফাইভ এর ‘আর আমি’ গানটি। আবার রকাফোবিক-এর ‘জন্মান্তর’ গানটিতে এম্বিয়েন্ট ফ্লেভার খুজে পেতে পারেন কেউ কেউ।

ব্লু-প্রিন্ট

রকাফোবিক

ইমপ্লিসিটকে বাংলাদেশের এলিস ইন চেইন্স বললে ভুল হবে না। তাদের “অদৃশ্য” গানটিতে লিরিকের ধরণ থেকে শুরু করে বাজানোর ভঙ্গি, সব কিছুতেই গ্রাঞ্জের প্রাধান্য চোখে পরার মত।

মার্চ ২৯ এর “প্রাসাদের সন্ধ্যা” আর রেডিকাল সিমেট্রির “শিখা চিরন্তনে” এর মত সুন্দর দুইটি অল্টারনেটিভ রক ধাঁচের গানের পর সার্কেল -এর অল্টার মেটাল “অন্ধ” গানটিতে গিটারের টোন এবং ড্রামস কম্পোজিশন ব্লু-প্রিন্ট এ্যালবামটিকে পূর্ণতা এনে দিয়েছে।

এখন বলবো এই অদ্ভুত সুন্দর গান এবং ব্যান্ডগুলোকে একত্র করেছেন যারা তাদের কথা। অ্যালবামটির কো-অরডিনেটর ছিলেন কারনিভাল ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল টিনু রাশিদ। যিনি নিজেও বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক লিসেনারদের নতুন ধরনের সাউন্ড শুনিয়েছেন তার নিজের এক্সপেরিমেন্টাল রক নির্ভর ব্যান্ড কারিভালের মাধ্যমে। রেকর্ড লেভেল জি সিরিজ-কেও অসংখ্য ধন্যবাদ এই নতুন ব্যান্ডগুলোর পাশে থাকার জন্য। আপনারা অ্যালবামটির সিডি ছাড়াও গান অ্যাপে এই অ্যালবামটি শুনতে পারবেন।

ব্যান্ড কম্পাইলেশান এ্যালবাম গুলো এইদেশের ব্যান্ড গুলোর জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হয়ে আছে। অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ড, যারা এখন বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক সিনারিও রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে- তাদের শুরুটা হয়ছিল এই কম্পাইলেশান অ্যালবামগুলো থেকেই । শ্রোতারা আগুন্তুক সিরিজ, ছাড়পত্র, দিনবদল, আন্ডারগ্রাউন্ড সিরিজ, রক সিরিজের মত অ্যালবামগুলোকে কখনো ভুলতে পারবে না। আশা করি এই অ্যালবাম থেকে আমরা কিছু প্রথম সারির ব্যান্ড খুঁজে পাবো আর ব্যান্ডগুলো থেকে আশা করবও তাদের নিজস্ব অ্যালবাম।

আবারও শেষ করব কিছু দরকারী কথা দিয়ে যা নতুন এবং পুরানো সকল জেনারেশনেরই মাথায় রাখা উচিৎ। যদি আমারা এই ব্যান্ডগুলোকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তাহলে ফ্রি ডাউনলোডের মত সস্তা মানসিকতা বাদ দিতে হবে। মিউজিশিয়ানরা এত কস্ট করে আমাদের জন্য অ্যালবাম বানাচ্ছেন, লাখ-লাখ কোটি-কোটি মানুষ তার ধারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে আর তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু কি আমরা তাদের দিতে পারছি? এসব মানুষরা যদিও এইসব নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিয়েছে, তবুও শিক্ষিত হয়েও আমাদের মত শ্রোতা আর ভক্তরা যদি পাইরেসি করে অশিক্ষিতদের মত আচরণ করি, তাহলে ব্যান্ডগুলো আমাদের থেকে মুখ  ফিরিয়ে নিলেও আমাদের কিছু বলার থাকবে না। তাই সামান্য কিছু টাকা দিয়ে অ্যালবামগুলো কিনুন। অথবা তা না হলেও অন্তত অনলাইন থেকে গানগুলো কিনে শোনার চেষ্টা করা উচিৎ আমাদের সবার।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top