শিল্প ও সংস্কৃতি

সায়েন্স ফিকশন টু হররঃ এক মোড়কে চার [মুভি রিভিউ]

‘ঘরানা’ শব্দকে আপনি ‘জনরা’, ‘ধরন’, ‘রীতি’, ‘ধারা’ বা ‘প্রকার’ যে নামেই নির্দিষ্ট করুন না কেন এর গুরুত্বকে এতটুকু কমানো যাবে না । একেবারে শুরুতে গেলে, নির্বাক যুগের পর ‘মেলোড্রামা’, ‘ওয়েস্টার্ন’, ‘হরর’, ‘কমেডি’ এবং ‘একশন এডভেঞ্চার’ এর মতো প্রধান ঘরানার প্রবর্তন হয় । আবার ঘরানা বিশ্লেষণে গেলে সময়ের সাথে এর বিবর্তনকে বুঝতে হবে । সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক ভাবে সৃষ্ট ঘরানার পরিবর্তনের সাথে সাথে মূলত ঘরানার পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটে । ১৯৪০ ও ১৯৫০ সালের দিকে জনপ্রিয় হওয়া ‘ওয়েস্টার্ন সোলো হিরো’ ধারণার পরিবর্তিত সংস্করণই হচ্ছে বর্তমানের ‘ডিটেকটিভ’ বা ‘থ্রিলার’ ঘরানা । ‘মিউজিকাল’ ঘরানার সাথে আমাদের পরিচয় হয় চলচ্চিত্রে সবাক যুগ আসার পর । ১৯৫০ এর আগ পর্যন্ত তো ‘সায়েন্স ফিকশন’ ঘরানা জনপ্রিয় হয়েই উঠে নি! ছবির বিন্যাস, প্রসঙ্গ, বিষয়, মেজাজ, লক্ষ্যমাত্রা বা বাজেট দ্বারা ঘরানাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় । ‘যুগ্ম ঘরানা’ (রোমান্টিক কমেডি) যেমন রয়েছে তেমনি দুই বা ততোধিক ঘরানা মিলে আছে ‘হাইব্রিড’ ঘরানা ।

 

২০০১: অ্যা স্পেস ওডিসি (১৯৬৮)
ঘরানাঃ সায়েন্স ফিকশন
দেশঃ আমেরিকা/ব্রিটিশ
পরিচালকঃ স্ট্যানলি কুব্রিক

1

কুব্রিক স্পেস ওডিসিতে মূলত কল্পবিজ্ঞানের অবলম্বনে মানুষের বিবর্তন দেখিয়েছেন । মনোলিথ (কৃষ্ণ স্তম্ভ) ব্যবহৃত হয়েছে বিবর্তনের ‘মাধ্যম’ হিসেবে । ছবিটিকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করলে এর বোধগম্যতায় আসতে সহজ হবে । প্রথম পর্যায়ে মানুষের আদিরূপ ‘এপ’রা মনোলিথের সংস্পর্শে এসে জাগতিক সত্তাপ্রাপ্ত হয়, অস্ত্রের ব্যবহারে অস্তিত্বরক্ষার মন্ত্র শিখে । কিছু আয়ত্তে আনার উল্লাসে আকাশে ছুড়ে ফেলা অস্ত্ররূপ ‘হাড়’ থেকে ‘স্পেসশিপ’ রুপান্তরের মধ্য দিয়ে ছবি দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে । এ পর্যায়ে স্পেসশিপে করে মানুষ চাঁদে আসে । বুদ্ধির ক্রমবিকাশে মানুষ এবার মনোলিথ সম্বন্ধে অবগত এবং মনোলিথের সংকেতে তারা জুপিটারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় । এ পর্যায়েই নভোচারীরা ‘হাল-৯০০০’ নামক এক কম্পিউটার যন্ত্রের মুখাপেক্ষী হয়, যার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মতোই! সেই জুপিটার যাত্রায় আলোর ঘূর্ণ্যামান গতির মধ্য দিয়ে নভোচারী পরের পর্যায়ে প্রবেশ করে । এবার নভোচারী নিজেকে একটি বেডরুমে খুঁজে পায় । রুমটিতে কোনও দরজা নেই। বেডরুমের এই দরজা দিয়ে বরং ওই মনোলিথকেই বুঝানো হয়েছে । মনোলিথের সাহায্যে নভোচারীটির পরবর্তী একেক বিবর্তন আমাদের জানান দেয় এই ক্রমবিকাশের শেষ নেই! মহাবিশ্বের অপার রহস্যে এই অজানাকে নিজের মতো করে জেনে নিতে এভাবেই চিন্তার সলতে জ্বালিয়ে দিয়েছেন কুব্রিক । স্পেস ওডিসি এমন এক ছবি, যার চরিত্র ধরে বা ছকে বাঁধা কোন ব্যাখ্যা নেই, যার অবয়ব অঙ্কিত সহস্র বছরে! চরিত্রের মধ্যে নেই মতবিরোধ! ছবির সংলাপ বরং বর্ণনা ক্রিয়াকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়! অত্যধিক মন্তাজ শট ভিজ্যুয়ালি সুখকর কিন্তু গল্পকে এগিয়ে নেয় না! আবহ সংগীত অনুভূতিতে ব্যাঘাত আনে! অথচ এই ছবিই কি না মুক্তির পর থেকে আজও দর্শক-মন বুঁদ করে রেখেছে! এখানেই বোধহয় কুব্রিক শতভাগ সফল ।

IMDB Rating: 8.3
Rotten Tomatoes: 94%

 

দ্য গডস মাস্ট বি ক্রেজি (১৯৮০)
ঘরানাঃ কমেডি
দেশঃ দক্ষিণ আফ্রিকা
পরিচালকঃ জ্যামি উইস

2

ছবির পর্দা উঠে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গম মরুভূমি কালাহারিতে । শিকার আর সংগ্রহ করে জীবন ধারণে অভ্যস্ত আর বাইরের সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চলের মানুষদের বলা হয় ‘বুশম্যান’ । সম্ভবত তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সন্তুষ্ট সম্প্রদায় । যাদের মধ্যে কোন অপরাধ নেই, শাস্তি নেই, হিংস্রতা নেই, আইন নেই, নেই কোন শাসক! তারা এই বিশ্বাসে খুশী যে ঈশ্বর তাদের সবকিছুর পর্যাপ্ত পরিমাণে যোগান দিচ্ছেন । একদিন আকাশ থেকে কিছু একটা কালাহারিতে এসে পড়লো, ‘জিজো’ (যাকে ঘিরে গল্প) তার জীবনে এমন কিছু কখনোই দেখে নি! এটা দেখতে পানির মতো, কিন্তু এর থেকে শক্ত কিছু যেন পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই! সে বিস্মিত হয়ে ভাবলো ঈশ্বর এমন একটা কিছু কেন পৃথিবীতে পাঠালেন? বুশমেন সমাজে এ নিয়ে রাজ্যের আলোচনা! এত অদ্ভুত সুন্দর কিছু তারা কখনো দেখেনি । শীঘ্রি এটি তাদের নিত্যদিনের কাজের প্রয়োজনীয় বস্তু হয়ে গেল । ধীরে ধীরে বস্তুটির অপরিহার্যতা গেলো বেড়ে । বাঁধলো সমস্যা! নির্দিষ্ট বস্তুটি সবার কাজেই চাই আর তাতে তাদের মধ্যে দেখা দিল ক্রোধ, ঈর্ষা, ঘৃণা ও হিংস্রতা! জিজো ঈশ্বরের উপর ক্ষেপে গেলো আর সিদ্ধান্তে আসলো এই ‘অনিষ্ট বস্তু’ নিশ্চয়ই ঈশ্বর ভুলবশত পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন । এটিকে তাই পৃথিবীতে রাখা যাবে না ফেলে আসতে হবে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে । উল্লিখিত সেই ‘বস্তু’টি একটি কোকা-কোলার বোতল! জিজো বোতলনিয়ে রওয়ানা হল । সেই পথে সভ্যতার সাথে অপরিচিত জিজোর দেখা হবে সভ্য জগতের নানান মানুষের সাথে! যাদের একজন জীববিজ্ঞানী, স্কুল শিক্ষিকা, ট্যুর গাইড, মেকানিক আর গেরিলা দলের নেতা । ঘটনাক্রমে চরিত্রগুলো যায় জড়িয়ে, তৈরি হয় হাস্যকর পরিস্থিতি । শেষে বুশম্যানদের অদ্ভুত সব বিশ্বাসের একটা নমুনা দেই, বুশম্যানদের ধর্মানুষ্ঠানে আপনি যদি তাদের আপ্যায়নের ইচ্ছায় আমন্ত্রণ জানান জবাবে তারা আপনাকে কটু কথা শোনাবে! আপ্যায়নে পর্যাপ্ত খাবার থাকা সত্ত্বেও তারা বলবে সেই খাবারে তাদের একবেলার যোগান পর্যন্ত হবে না কারণ তারা বিশ্বাস করে খাবারের প্রশংসা করা মানে খাবারের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যাওয়া!

IMDB Rating: 7.3
Rotten Tomatoes: 95%

 

চার্লি (২০১৫)
ঘরানাঃ রোমান্টিক ড্রামা
দেশঃ ভারত
পরিচালকঃ মার্টিন প্রাক্কাত

3

নতুন ঘরটা গোছাতে গোছাতে ‘টেসা’র হাতে পড়লো একটা স্কেচবই । বইটার একেকটা পৃষ্ঠা এগোয় টেসার কৌতূহল ততই বাড়ে! কৌতূহল যখন চূড়ায় বইটার পৃষ্ঠা ততক্ষণে উপসংহার না টেনে শেষ! কিন্তু একটা পরিণতি তো চাই । এবার টেসার কৌতূহল গিয়ে পড়লো বইটার একটা চরিত্রে । চরিত্রের নাম ‘চার্লি’ । নিজের নাম যতটা অদ্ভুত তার চেয়েও অদ্ভুতুড়ে তার কান্ডকারখানা! টেসার এবার চার্লিকে খুঁজে পাওয়া চাই । একটি ছোট ফটোগ্রাফ থেকে তার চেহারা হয়তো সামনে এলো কিন্তু জানা হল না তার সম্বন্ধে কিছুই । যেন সে রোদের মধ্যে ছায়া, বিভ্রমে বিলীন হওয়া! অঙ্গুলিতে কবিতা তুলে ওই পথেই বেরিয়ে পড়া । তবে কি সে সেই যাকে সুদূরে উড়ে যেতে মায়াবী হাওয়া ডানা দিয়েছিল? সাদা পায়রা হয়ে সে উড়ে নীলাকাশ পানে । কল্পনায় চোখে বাতাসের মৃদু ঝাপটা আনে । কে সে? কোন মোহঘোর? নাকি কোন স্বপ্ন যাকে দেখা যায়? টেসার মন খুঁজে ফেরে । সেই প্রক্রিয়ায় চার্লি ধরা দিল এমন এক অবয়বে, গতানুগতিক জীবনধারাকে পদে পদে বিদ্রুপ করাই যার কাজ! নিয়মে আবদ্ধ মন ভেবে অবাক হয় কেউ কিভাবে নিজের শর্তে বাঁচে, কেবল শুনে ভাবনাহীন হৃদয়ের আহবান! আমরা হয়তো সে জীবন নিয়ে ভাবি, গুটিকয় সে জীবনে বাঁচে । চার্লি তাদের একজন । এমন একটি চরিত্রকে হৃদয়গ্রাহী করবার পেছনে মূল দায়িত্বে ছিলেন ছবির চিত্রগ্রাহক ‘জমন টি জন’ । তার চিত্তাকর্ষক রঙিন ফ্রেমে লুণ্ঠন করা চিত্রধারন যেন চার্লি মনের প্রতিফলন । আর আমরা শুধু সেই প্রতিফলনে চরিতার্থ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে যাই ।

IMDB Rating: 7.7

 

দ্য অরফানেজ (২০০৭)
ঘরানাঃ হরর
দেশঃ স্পেন
পরিচালকঃ জোয়ান এন্টোনিও বায়োনা

4

শৈশবে মায়ের কোলে শুয়ে শোনা কোন ভূতের গল্পে মনের মধ্যে যে ভয় সঞ্চার করতো সেটিকে কোন ভৌতিক ছবির নাম দিয়ে দিব্যি চালিয়ে দেয়া যায় । এবার মা-সন্তানের সেই সংবেদনশীল সম্পর্কে যদি ভৌতিক উপাদান মিশিয়ে দেয়া হয়? ক্যারিয়ারের প্রথম ছবি দিয়ে দর্শকদের ভয় দেখাতে পরিচালক ‘জোয়ান এন্টোনিও বায়োনা’ এমনই এক স্পর্শকাতর সম্পর্ককে বেছে নিলেন । ছবির শুরুতেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় স্পেনের একটি অনাথাশ্রমে । একই অনাথাশ্রমে শৈশব কাটিয়ে যাওয়া ‘লৌরা’ অনেক বছর পর তার স্বামী ও সাত বছরের দত্তক ছেলে সিমনকে নিয়ে বন্ধ পড়ে থাকা সেই অনাথাশ্রমে ফিরে আসে । লৌরার ইচ্ছা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অনাথাশ্রমটি পুনরায় চালু করা । অনাথাশ্রমটি চালুর দিন মার সাথে ঝগড়ার জের ধরে সিমন লুকিয়ে যায় । তারপর আর কোথাও তার সন্ধান মেলে না! পাগলপ্রায় মা সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার আশায় সাহায্য নেয় সম্ভবপর সবকিছুর । সিমনকে ফিরে পাওয়ার সব পথ যখন ধোঁয়াশায় লৌরার তখন মনে পড়ে সিমন হারিয়ে যাবার আগে লৌরাকে একটি খেলা শিখিয়ে যায় । যেটির বিজয়ীকে একটি ইচ্ছা পূরণ করতে দেয়া হবে । নিজের বাচ্চাকে ফিরে পেতে মা’র ব্যাকুলতার আশ্রয় যখন সেই খেলা, ভয়ের গল্প তখন হৃদয় ছোঁয়ায় ব্যস্ত । ছবির পরিণতি ক্রমশ কৌতূহল বাড়ায় । সিমনের হারিয়ে যাওয়াকে অনুঘটক করে এবং অনাথাশ্রমে তৈরি যন্ত্রণা আর শিহরণের মধ্য দিয়ে পরিচালক অতি যত্ন সহকারে দর্শকের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেন । বার্তাটি জানান দেয়, সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার গভীরতা ।

IMDB Rating: 7.5
Rotten Tomatoes: 87%

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top