নাগরিক কথা

জঙ্গি আক্রমণ থেকে বাঁচার কিছু সহজ উপায়

দেশের সাম্প্রতিক জঙ্গী হামলা নিয়ে ভীত? নিজের জীবন নিয়ে শংকিত? ভয় পাবেন না, ১০টা মিনিট খরচ করে এক নিঃশ্বাসে পড়ে জেনে নিন কিছু সহজ টিপস।

(১)

একটা সিম্পল সিনারিও চিন্তা করি চলেন। আগেই বলে রাখি, শুধু তোতা পাখির মত পড়ে গেলে চলবেনা। ঘটনাটা কল্পনা করতে হবে, চিন্তা করতে হবে।

ধরি আপনার নাম ফারুক। প্রতিদিন একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দেন বন্ধু বান্ধব, এলাকার ছোটভাইদের নিয়ে। সবাই আপনাকে চিনে এবং মানে, সম্মান করে। আপনি প্রায় দিনই আড্ডার শেষে সবার বিল খাতায় লিখে রাখতে বলে একেবারে মাসের শেষে দিয়ে দেন। এখন ধরি, একটা ছেলে কাসেম – যাকে আপনি চিনেনও না, দোকানে এইটা সেইটা খায়, তারপরে দোকানদারকে বলে বিল ফারুক ভাই দেবে। আপনি যেহেতু প্রায় সময় বিল দেন, তাই দোকানের মামা বিশ্বাস করে টাকা নেয় না তার থেকে, আপনার নামে জমা করে দেয়। একসময় ব্যাপারটা ধরা পড়লো। এখন আপনার যে বন্ধুবান্ধবরা আছে, তাদের মধ্যে জলিল চিৎকার করে বলে উঠলো যে কাসেম ফারুক ভাইয়ের নাম ব্যাবহার করে দোকানে ফাউ খায়। সবাই খুব রেগে গেলো। কাসেমের খবর আছে।

কাসেম তো এই বিপদের ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক। সে দুই একজন চ্যালা চামুণ্ডা যোগাড় করে রেখেছে আগেই। এরাও চিৎকার করে বললো যে কত বড় সাহস, জলিল আমাদের প্রিয় ফারুক ভাইকে অপমান করে, তার নামে বাজে কথা বলে। ফারুক ভাইয়ের কি দোষ? জলিল ফারুক ভাইকে অপছন্দ করে। জলিল খারাপ। এ কথা শুনে অনেক জলিলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলো। সবাই উত্তেজিত। জলিলকে টাইট দেয়া হউক। অনেকে তখন জলিলের পক্ষে কথা শুরু করলো জলিলের কি দোষ? কাসেমের লোকরা একটু গুজবও ছড়াল। দুই পক্ষের কথাবার্তাই আশেপাশের মানুষজন শুনলো। তারপরে দুইভাগ হয়ে মারামারি শুরু করলো। কাসেমের লোকজন আরও একটিভ হয়ে গুজব, হেইট স্পিচ ছড়ালো। মানুষ খেপতেই থাকলো। কলহের তীব্রতা, অশান্তি আরও বাড়তে থাকলো। কাসেম চক্র এভাবে আরও কয়েকটা টং থেকে ফাউ খেতে থাকলো। ফারুক ভাই আত্মভোলা উদার মানুষ। উনার এগুলিতে কিছু আসে যায়না।

এবার দেখেন ঘটনার প্রবাহ।

১) “কাসেম ফারুক ভাইয়ের নাম ব্যাবহার করে দোকানে ফাউ খায়।”এই কথার মানে কিন্তু এই না যে ফারুক দোষী।

২) যেখানে সবাই একসাথে কাসেমকে টাইট দেওয়ার কথা, সেখানে এখন নিজেরাই দুইভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে।

৩) দোকান মালিক কিন্তু একগাদা টাকা লস খেয়ে ভিকটিম।

৪) কাসেম – যার কপালে পাবলিকের ধোলাই ছিলো, সে আরামে দুরে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে আর কয়েকজন নতুন ছেলেকে শিখাচ্ছে কিভাবে টং থেকে বাকী খেতে হয়। সে কিন্তু বিশাল গুটিবাজ।

দুই পক্ষের বিবাদে ৩য় পক্ষের লাভ সবসময়। দেখেন আল্টিমেইটলি কি হইলো। সাধারণ পাবলিক নিজেরা মারামারি করে নিজেদের ক্ষতি করলো। চায়ের দোকানদারেরা মরতেই থাকলো। কাসেমরা দিনশেষে লাভবান হতে থাকলো।

 

এইবার চরিত্রগুলির নাম পালটাই।

১) কাসেম = জামাতে ইসলামী, শিবির, আইসিস, আনসার আল ইসলাম, আরও যত জঙ্গি সংগঠন = আসল গুটিবাজ

২) ফারুক = ইসলাম ধর্ম = কোন ভূমিকা নাই তার নাম ইউজ করা ছাড়া।

৩) চায়ের দোকানদার = যারা খুন হচ্ছে জঙ্গি এটাকে = সরাসরি ভিকটিম।

৪) জলিল সহ বাকী জনগণ = আমি, আপনি, সাধারণ মানুষ = বর্তমানে পরোক্ষভাবে ভিকটিম, ভবিষ্যতের বলির পাঁঠা।

 

যারা একটু চিন্তা করতে পেরেছেন তারা নিশ্চয়ই ঘটনা বুঝে গেছেন। যারা পারেননি আবার পড়তে পারেন আস্তে ধীরে। এটা একটা রূপক উদাহরণ, তাই সব নিখুঁত হবেনা এটাই স্বাভাবিক।

 

একদম শুরু থেকে একটা গোষ্ঠী ধর্মের নাম ব্যবহার করে আমাদের দেশে খুনাখুনি চালিয়ে যাচ্ছে। এদের দিকে যখনি আঙ্গুল দেখানো হয় তখনই একদল মানুষ হাহাকার করে উঠেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম এগুলি সাপোর্ট করেনা। ভাই থামেন প্লিজ। উপরের উদাহরণের মত গুটিবাজির শিকার হবেন না। কেউ ইসলামকে ইউজ করে সন্ত্রাস চালাচ্ছে – এই কথা বলার মানে এই না যে সবই ইসলামের দোষ। এই কথা বলা মানে সন্ত্রাসীর দোষ। আপনার কেন মনে হয় যে সারা দুনিয়াতে যখন মানুষ মারা হচ্ছে তখন সবাই সবকিছু বাদ দিয়ে সন্ত্রাসের পিছনে না লেগে ধর্মের পিছনে লাগবে?

 

সুতরাং, কেউ যখন বলবে যে সন্ত্রাসীরা আল্লাহ্‌ আকবর বলে হামলা চালিয়েছে। আপনার দোহাই লাগে, সঠিক জায়গায় ফোকাসটা রাখেন। ধরেই নিয়েন না যে তার ইসলাম ধর্মকে এটাক করা ছাড়া কাজ নাই কোন। সে সন্ত্রাসকে এটাক করেছে। মানুষের খেয়ে দেয়ে অনেক কাজ আছে।

 

অবশ্য সহজেই আপনার এরকম বিভ্রান্ত হওয়ার পিছনেও অনেক কারণ আছে। কাসেমের মত লোকেরা ক্রমাগত বছরের পর বছর আপনার কানে দিয়ে আসছে সারা পৃথিবী মুসলিমদের পিছনে লেগে আছে। মুসলমানেরা সারা বিশ্বে নির্যাতিত। বাঁশেরকেল্লা, বঙ্গমিত্র এরা বছরের পর বছর ফটোশপড ছবি দিয়ে হলেও প্রোপাগান্ডা চালিয়ে গেছে। আমি অস্বীকার করবো না আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইনের কথা। যুদ্ধ, পলিটিক্স সমাজের অন্য লেভেলের লোকজনের খেলা, কাসেমদের। আমি, আপনি কিন্তু সাধারণ মানুষ। ভিকটিম কিন্তু আমরাই হই। বুঝতে হবে কথাটা। এই উপমহাদেশেও কিন্তু দাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে কি আমি আমার পাশের ঘরের মানুষটাকে মারা যেতে দেখলেও কিছু করবোনা? আমি যখন দেশে ছিলাম তখন ধারণা ছিলো আমেরিকাতে মুসলিমদের অবস্থা খুব খারাপ। উঠতে বসতে পুলিশ হয়রানী করে। এখানে আসার পরে কিন্তু এমন কিছু চোখে পড়েনাই। আমি যেখানে থাকি সেখানে অনেক মসজিদ আছে। আমি ৪/৫ টায় গিয়েছি পর্যন্ত ইফতারি খেতে। আমেরিকার জীবন অনেক একা একা। মসজিদে গেলে বাংলাদেশের মত অনেক লোক একসাথে দেখা যায় এইজন্য যাই। গিয়ে আমার মনে হয়নাই, এরা নির্যাতিত। আমার পরিচিত অনেক মুসলিম আছে এখানে। প্রায় সবাই। কাউকে মুসলিম বলে হয়রানী হতে দেখিনাই। বরং সব বাদামী চামড়াদের দিকে এরা একটু অন্যভাবে তাকায়। এর শিকার আমিও।

হয়রানী যে একদম হয়না তা না। কিন্তু জামাতের লোকজনের একটা ভালো নেটওয়ার্ক আছে বাংলাদেশে। এরা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খবর বানিয়ে মানুষ ক্ষেপায়। আপনি শোনেন আর বিশ্বাস করে সবার উপর রাগতে থাকেন, ঘৃণা করতে থাকেন। সত্য মিথ্যা যাচাই দেশের খুব কম মানুষই করে। তাই আপনরা দোহাই লাগে, সবাই আপনার পিছনে লেগে আছে এই অমূলক ধারণাটা বাদ দেন। সবাই লেগে আছে সন্ত্রাসের পিছনে।

 

(২)

গুলশানে আইসিসের এটাক আমাদের দেশের জন্য খুবই অ্যালার্মিং ঘটনা। শুরু থেকে দেখে আসছি কিছু মানুষ প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে বাংলাদেশে আইসিস নাই। সব ইন্ডিয়া আমেরিকার প্রচারণা। এগুলির গোঁড়া কিন্তু কাসেমদের মত লোকেরা। আমি আপনি না বুঝে পা দিচ্ছি সাধারণ মানুষের মত। কিন্তু মনে রাখবেন- শেষে এর ভিকটিম আমরাই হবো।

দেশ খুব বড় ধরণের দুর্যোগের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

কয়েকবছর আগে সাইদী ওয়াজে ভিন্নধর্মীদের বিরুদ্ধে মানুষ খেপাতো। শিবির রগ কেটে প্রগতিশীল ছাত্রনেতাদের মারতো। আপনার গায়ে লাগতোনা বলে আপনি চুপ থাকতেন।

জেএমবি এসেছিলো সন্ত্রাস চালাতে ইসলামের নামে। দেশের মানুষ কনফিউজড ছিলো। মানুষ কিন্তু ওরা ঠিকই মেরেছে।

তিন বছর আগে যখন ব্লগার মেরেছিল, সেগুলির সময় আপনি ভেবেছেন ওরা নাস্তিক বলে মেরেছে। চুপ থেকেছেন। মেরেছিল আনসার আল ইসলামের নামে।

শিক্ষক মারলো, সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানুষকে মারলো, প্রকাশককে মারলো। আপনি এর মধ্যে কোনটাই নয় বলে চুপ ছিলেন।

 

আজকে হঠাত দেখলেন শিবির, জেএমবি, আনসার আল ইসলাম থেকে আইসিস চলে এসেছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যি। সিরিয়ার ঘটনা আপনি জানেন কি করেছে আইসিস। খুন, ধর্ষণ, যৌনদাসী বানানো সব জঘন্য কাজ করেছে এরা। এদের বিরুদ্ধে যখন কেউ কথা বললো আপনার কানে কেউ বলেছিল যে এরা ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলছে। আপনিও নেচেছেন। আইসিসের পিছনে না লেগে লেগেছেন সাধারণ মানুষের পিছনে। ফলাফল?

এনিমি এট দ্য গেইটস। শত্রু দরজায়।

এখন কে কটূক্তি করছে এটা দেখার সময় না। দোহাই লাগে আপনার। চোখ বুঝে রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকেনা। আপনাকে ওরা ব্যস্ত রাখছে ইসলামের কটূক্তি নিয়ে। এই ফাঁকে এরা আপনার ছোটভাইটাকে ব্রেইনওয়াশ করছে। তাকে দিয়ে মিশন করাচ্ছে। দিনশেষে আপনার বন্ধু, ছোটভাই মারা যাবে। তার হাতে মরবে আপনার প্রতিবেশী। কাসেমদের কিছু হবেনা। ততক্ষণই হবেনা যতক্ষণ আপনি চুপ থাকবেন।

আপনি যদি বিশ্বাস করেন ওরা কোরান শরীফের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গি বানাচ্ছে, তাহলে আপনি প্লিজ কোরান শরীফ পড়ে তাকে সঠিক ব্যাখ্যা দিন। চুপ করে বসে বসে অন্যের দিকে আঙ্গুল তুলবেন না।

 

(৩)

যেই ছেলেগুলি জঙ্গি হয়ে গেছে তাদের ফেসবুক একাউন্ট দেখে মনেই হয়না এরা জঙ্গি হতে পারে। পোশাকে আশাকে স্মার্ট শিক্ষিত পোলাপান। হুট করে ব্রেইনওয়াশ হয়ে মানুষ মারতে চলে গেলো। একটা ছেলে কয়েকমাস আগে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো Every life matters, I love you mom. এই ছেলে গুলশানে ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট এক মহিলাকে খুন করেছে। মিলানো যায় সমীকরণ? সমীকরণ কি মিলবে? আপনি হয়তো সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তাও করতে পারেন না একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার গলায় ছুরি চালানোর কথা। কিন্তু জঙ্গী ব্রেইনওয়াশের কারিগররা কিন্তু তাই বলে বসে নাই, তারা ঠিকই একেকটা ছেলেকে রিক্রুট করে তাকে দানব বানিয়ে অপারেশনে নামাচ্ছে।

আপনি কি একবারও তাদের অস্ত্র, টেকনোলজির দিকে দেখেছেন? কি রকম ট্রেইনিং নিয়ে এরা অপারেশনে নেমেছে? এরা কিন্তু অনেক ইউনাইটেড। স্ট্রাকচারড। আমাদের দেশ অনেক বড় ষড়যন্ত্রের মুখে। এরা ধর্মের নামেই ব্রেইনওয়াশ দেয়। মানুষ মারে। তারপর আপনি ব্যস্ত হয়ে যান ধর্মকে বাঁচাতে। আপনি বলতে থাকেন ইসলাম এগুলি সাপোর্ট করেনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো আপনার সামনে যখন আইসিস পড়বে তখন এই কথা বলার আগেই তারা আপনাকে খুন করবে। সুতরাং সঠিক জায়গায় ফোকাস করেন। এরা যদি ধর্ম ব্যবহার করে খারাপ কাজ করাতে পারে, আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে ধর্ম খারাপ কাজ করতে বলেনা, তাহলে চলেন ধর্ম দিয়েই এদের খারাপ হওয়া আটকাই। আমরা সাধারণ মানুষ। বেশী কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নাই। কিন্তু নিজের ছোটভাইটাকে তো বুঝাতে পারি। তার বন্ধুদের, নিজের বন্ধুদের, পাশের বাসার ছেলেটা ব্রেইনওয়াশড হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখি। তাকে আটকাই। লাগলে একটু পড়াশোনা করি। সেই জ্ঞান দিয়েই তাকে বোঝাই মানুষে মানুষে ভালোবাসার গুরুত্ব।

যে বয়সে একটা ছেলের ঈদের শপিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, গরীব বাচ্চাদের সব বন্ধুরা মিলে কাপড় দেয়ার কথা, আর্টসেলের আসন্ন এলবাম নিয়ে এক্সাইটেড থাকার কথা সে কেন আমরা এতগুলি মানুষ থাকা সত্ত্বেও ঘরের এককোনায় বসে কাসেমদের খপ্পরে পড়ে খুনি হয়ে যাবে? সে একটা খুন করার পরে কেন আমরা একে অন্যকে দোষ দিতে থাকবো?

আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের শক্তি হয়তো অনেক কম। কিন্তু সবাই মিলে কি আমরা এতই দুর্বল যে নিজের ছোটভাই, বন্ধুকে ঠিক পথে রাখতে পারবোনা? তাকে ঘৃণার বদলে ভালোবাসার শিক্ষা দিতে পারবোনা?

 

(৪)

সরকারের উপর হতাশ আমি, আপনি – তাই না? সরকার বলে এসবই বিএনপির কাজ, বিএনপি বলে এগুলো ভারতের সাথে মিলে সরকারের ষড়যন্ত্র। এগুলি কিন্তু চলছেই। আপনিই বলেন, একে অন্যকে দোষ দিয়ে কি ঘরের আগুন নেভানো যায়? আপনার ঘরে যখন আগুন লাগে, তখন আপনি কি সরকারের জন্য বসে থাকেন? থাকেন না। আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কাসেম যদি কানে কানে বলে যে “পাশের বাড়ির পল্টু আগুন লাগাইসে”, তখন আপনি কি করবেন? আগে কি ঘরের আগুন নিভাবেন না, নিজেকে বাঁচাবেন না? একমাত্র বেকুব হলেই আপনি ঘরে গায়ে আগুন রেখে পল্টুকে খুঁজতে যাবেন।

এখন খুবই ক্রাইসিস মোমেন্ট। এখন এগুলি হিসাব করার সময় না। আমি জানি অনেক লোকজন ধর্ম নিয়ে চটি লিখে। আপনি যদি সত্যিই ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে থাকেন এর বিচারের ভার ঈশ্বরের কাছেই দেন না। আমি হিন্দু। ছোটবেলা থেকে ওয়াজ মাহফিলের কল্যাণে জেনে আসছি আমি অধম, মালাউন। এর জন্য কি আমি আমার মুসলিম বন্ধুকে মারতে গেছি? যাইনাই। একটু ইগনোর করতে শিখুন। ক্ষতি নাই, লাভ আছে।

এখন ইগো দেখানোর সময় না। কাসেমরা এটাই চায়। ইগো দেখিয়ে, ধর্মের কথা বলে মানুষকে আলাদা করতে। শিবিরের মত সন্ত্রাসী সংগঠন কিন্তু একটা নামাজের রুটিন দিয়েই দলে টেনে ব্রেইনওয়াশ দেয়া শুরু করে। আসেন, একে অন্যকে দোষ দেয়া বন্ধ করি। আপনি লীগ সমর্থক হলে, সবকিছুতে বিএনপি’র দোষ খুঁজতে যাওয়া অফ করেন। আপনি বিএনপি-স্মুর্থক হলে জামাতের কথায় নেচে সবকিছুতে ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার না করে লীগকে দোষ দেয়া বন্ধ করেন। আপনি আস্তিক, আমি নাস্তিক; কিংবা তার উল্টোটা। আসেন একে অপরকে দোষ দেয়া বন্ধ করি। দিনশেষে মরলে আমরাই মরবো। নেতাদের কিছু হবেনা। গুটিবাজ কাসেমদেরও কিছু হবেনা। এখন ভাগাভাগি হওয়ার সময় না। এখন এক হওয়ার সময়।

ছোটবেলায় স্কুলে যেমন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-দোকানদার-টিচার, লীগ-বিএনপি-বাম-ডান সবার ছেলেমেয়ে আমরা একসাথে পড়াশোনা করতাম, বন্ধুর বিপদে তাকে ভালবেসে এক হয়ে এগিয়ে আসতাম, এখন আসেন আমরা সব ভেদাভেদ বিসর্জন দিয়ে একে অন্যকে দোষারোপ বাদ দিয়ে এক হয়ে বাংলাদেশ হয়ে যাই। এই বাংলাদেশের কাছে কোন কাসেম পার পাওয়ার কথা না। আর এখন যদি আমরা এক হয়ে এই সন্ত্রাসের প্রতিরোধে না নামি তাহলে এক সময় আমাদের পরিণতি সিরিয়ার চাইতে ভালো হবে না।

এই দেশের মানুষের টাকায় আমরা পড়াশোনা করেছি, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। এটা কিভাবে আমরা এড়িয়ে যাই? চলেন হতাশ না হয়ে এক হই। অনলাইনে-অফলাইনে নিজের ইগো বিসর্জন দেই। আমি সঠিক, নাকি আপনি সঠিক এর চাইতে বড় সঠিক হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদেরকে বাঁচানো জরুরী। দেশে বিদেশে সব তরুণ বাংলাদেশীরা এক হলে, সবাই সচেতন হলে আমরা অবশ্যই পারবো এই পরিস্থিতি সামলাতে। আসুন সরকারের দিকে তাকানো বন্ধ করি। নিজের জায়গা থেকে কাজ করি। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ অমুক দল, তমুক দল আমরা সবাই কাসেম তথা জামাত, শিবির, আনসারউল্লাহ বাংলা, হিজবুত তাহরীর, আইসিস এদের বিপক্ষে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে বাংলাদেশ হয়ে যাই। আমরাই জিতবো। না জিতলেও আফসোস থাকবেনা। আমরা তো চেষ্টা অন্তত করেছি। প্লিজ মনে রাখুন যে ইসলামিক টেরোরিস্ট বলতে ইসলামকে বোঝায় না। টেরোরিস্টকে বোঝায় যে ইসলামের নাম ব্যাবহার করছে। চিন্তা করুন, মাথা খাটান। আসুন এক হই। কারণ একতাই শক্তি।

এই সময়টা ইসলাম শান্তির ধর্ম বলে মাথা মাটিতে গুঁজে রাখার না।

এই সময়টা ইসলাম এগুলি সাপোর্ট করেনা বলে দায়িত্ব এড়ানোর না।

এই সময়টা মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী বলে আপনার পাশের বাসার পুরা ফ্যামিলিকে সন্ত্রাসী বানানোর না।

এই সময়টা ইরাক, প্যলেস্টাইন নিয়ে কান্নাকাটির না।

এই সময়টা ইসলাম ছাড়া সব কিছু খারাপ বলে গো ধরে থাকার না।

এই সময়টা আমাদের কাছে ইসলাম শান্তির ধর্ম না বলে যারা বিপথে যাচ্ছে ধর্মের নামে তাদের কে বলার।

এই সময়টা অমুক ঘটনার সময় আপনি কোথায় ছিলেন বলার না। সময়টা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আমরা কিভাবে বাঁচাবো এটা ঠিক করার।

এই সময়টা সবাই এক হওয়ার। সময়টা বাংলাদেশকে রক্ষা করার। কাসেমদের কে প্রতিহত করার। আমরা পারবো। পারতে হবে।

United we stand. Divided we fall.

 

(৫)

এই লেখা পড়ছেন এমন কেউ যদি হিরো হবার নেশায় জঙ্গি হওয়ার রাস্তায় অলরেডি থেকে থাকেন তাহলে আপনাদের জন্য জিম্মিদের থেকে পাওয়া একটা সত্যি ঘটনা। গুলশানের ঘটনায় ফারাজ হোসেন নামে একটা ২০ বছরের ছেলে নিহত হয়েছে তার প্রায় সমবয়সী জঙ্গিদের হাতে। সকালে জঙ্গিরা ১৩ জন জিম্মিকে ছেড়ে দেয়। তারা ফারাজকেও বলেছিলো চলে যেতে। ফারাজের সাথে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়া দুইজন মেয়ে ছিলো। ফারাজ এদেরকে ছাড়া বের হবেনা বলে। পরে তাকে ওই দুইজন মেয়ের সাথে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। দুইজন পুলিশ অফিসার এই ঘটনায় নিহত হয়েছে জঙ্গিদের আক্রমণে।

জানেন আসল হিরো কারা? এরাই আসল হিরো। এদের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। ২০ বছরের এই ফারাজ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো মানুষ হিসাবে কিভাবে মানুষের পাশে থাকতে হয় সাহসিকতা নিয়ে। পুলিশ অফিসার রবিউল এবং সালাহউদ্দিন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন প্রফেশনালিজম, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিভাবে আত্মত্যাগ করতে হয়। ভালোবেসে হিরো হওয়া যায়। ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে মানুষ মেরে, ধর্ম কায়েমের নামে সন্ত্রাস করে শর্টকাটে জান্নাতে যাওয়া যায়না।

 

*বিঃদ্রঃ জঙ্গিবাদের হাত থেকে বাঁচানোর সহজ উপায় জানানোর নাম করে আপনাকে এতটুকু পড়ানোর জন্য আমরা দুঃখিত। জঙ্গিবাদ থেকে বাঁচার আসলে কোন শর্টকাট নেই। সত্যি-সত্যি জঙ্গিবাদ থেকে যদি বাঁচতে চান, নিজেকে এবং পরিবারকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে চান, তাহলে একটু কঠিন পথে হাঁটতেই হবে- এর কোন বিকল্প নাই।

1 Comment

1 Comment

  1. Jack

    July 16, 2016 at 12:07 am

    Hello there! This post could not be written any better!
    Reading through this article reminds me of my previous roommate!
    He continually kept preaching about this. I’ll forward this post to him.
    Pretty sure he will have a good read. I appreciate you for sharing! http://www.yahoo.net

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top