নাগরিক কথা

আপনার পাশের মানুষটি-ই আপনার নিরাপত্তা

নিরাপত্তা

জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোন চাওয়া এই মুহুর্তে বাংলাদেশের মানুষের আর নাই। অথচ ২০১৩ সাল থেকে এই বাংলাদেশের মানুষই তাদের জীবনের নিরাপত্তাকে তিলে তিলে নষ্ট করেছে।

প্রথমেই নিরাপত্তা কীভাবে টিকে থাকে সেটা দেখে নিই। একটা দেশে মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে। এই একেকশ্রেণির নিরাপত্তা থাকে একেকরকম। ধর্মীয় শ্রেণির দিকে তাকালে ধর্ম পরিচয়ের কারণে এদেশে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম মুসলিমদের, এরপর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা, এরপর নাস্তিকেরা। পেশাজীবীদের কথা চিন্তা করি। পেশাগত দায়িত্বপালনের ঝুঁকি বাদ দিলে একজন সেনাসদস্যের অন্য কোন ব্যক্তি দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম, এরপর একজন আমলার, এরপর অন্যান্য পেশাজীবীদের এভাবে আলাদা করা যাবে। রাজনীতিবিদদের দিকে তাকালে একজন মন্ত্রীর জীবনের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি, এরপর একজন এমপির, এভাবে সবচেয়ে কম একজন তৃণমূলের কর্মীর।

আপনি যদি একটি বৃত্ত আঁকেন এবং তার ভেতরে বিভিন্ন ব্যাসার্ধের আরো অনেকগুলি বৃত্ত আঁকেন, তবে চিত্রটিকে নিরাপত্তার স্তর হিসেবে বর্ণনা করা যায়। সবচেয়ে বাইরের স্তরে থাকবে সবচেয়ে অনিরাপদ শ্রেণি এবং কেন্দ্রের কাছে থাকবে সবচেয়ে নিরাপদ শ্রেণি। ধরা যাক সবচেয়ের বাইরের স্তরে আছে তৃণমূলের কর্মী, এর ভেতরে তৃণমূলের নেতা, এভাবে একেবারে কেন্দ্রের কাছে মন্ত্রীরা। বিশেষ অবস্থা বাদ দিলে বাইরের স্তরের কর্মীরা যতক্ষণ নিরাপদ তার ভেতরের স্তরের মানুষেরাও ততক্ষণ নিরাপদ। বিশেষ অবস্থা বলতে ক্ষমতার কারণে বা অন্য কোন দ্বন্দ্বে বা স্বার্থে উপরের দিকের কোন নেতাকে হত্যার মত ব্যাপারকে বোঝাচ্ছি। জন এফ কেনেডি, বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান, রাজীব গান্ধী প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেগুলো বিশেষ কারণে।

সুতরাং আমরা সহজেই বুঝতে পারছি, বাইরের দিকের স্তর আসলে ভেতরের স্তরের জন্য নিরাপত্তাব্যূহ। বাইরের একটি স্তরের নিরাপত্তা যদি আর না থাকে তারমানে হলো, তার ঠিক ভেতরের স্তরটি তখন ‘ভালনারেবল’ বা নাজুক হয়ে গেলো। তার বাইরে আর কোন ব্যূহ নাই, সে নিজেই এখন নিরাপত্তার শেষ স্তর। এভাবে যতগুলো স্তর অনিরাপদ হবে, ভেতরের স্তরগুলোর নিরাপত্তা ততোবেশি কমে আসবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী প্রথমে এদেশের হিন্দুদের মারা শুরু করলো। হিন্দুরা দেশছাড়া হলো, মারা পড়লো, এরপর তথাকথিত মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ভুলে তারা নির্বিচারে মুসলমানদের হত্যা করা শুরু করলো। ২০১৩ সাল থেকে যখন নাস্তিকদেরকে হত্যা করা শুরু করলো তখন সাধারণ মানুষ তা গায়ে মাখলো না। বরং নাস্তিকহত্যার পক্ষে একধরণের নীরব সমর্থন গড়ে উঠলো। একে একে নাস্তিক হত্যা বেড়ে চললো। নীরব সমর্থনও সরব হতে থাকলো। কিন্তু সমর্থকেরা ভেবে দেখলো না তাদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বাইরের স্তরটি ভেঙে পড়ছে। নিজের দিকে ধেয়ে আসা বিপদকেই আসলে সে সমর্থন করে যাচ্ছে, অন্ধমন একথা বুঝতে চাইলো না। এরপর শুরু হলো হিন্দু-বৌদ্ধ পুরোহিত, ধর্মগুরুদের হত্যা যা এখনো চলমান, হয়ে গেল শিয়াদের অনুষ্ঠানে হামলা। নিরাপত্তার বেষ্টনীগুলো ভেঙ্গে গিয়েছে। এখন মূলধারার সুন্নি মুসলমানেরাও আর নিরাপদ নয়। নিরাপত্তার কিছু থেকে থাকলেও সেই স্তর ভেঙ্গে পড়তে সময় লাগবেনা।

২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে মানুষ মারা গেলো একশো জনের বেশি। প্রতিদিন পত্রিকায় আসে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আহত-নিহত হবার সংবাদ। কেন্দ্রের আশেপাশের নেতারা কি বুঝতে পারছেন যে, তারা ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছেন? নিরাপত্তাব্যূহগুলো যে একে একে আলগা হয়ে যাচ্ছে?

এই নিরাপত্তাব্যূহটা তাহলে কী, নিরাপত্তা কী? নিরাপত্তা হলো বৈচিত্র‍্য। চারপাশের বৈচিত্র‍্য যত বেশি রক্ষা করবেন, আপনি ততোবেশি ভালো থাকবেন, নিরাপদে থাকবেন। মতপার্থক্যের মতো তুচ্ছ ব্যাপারের জন্য আগ্রাসী হয়ে বিচিত্রতাকে নষ্ট করা, নষ্ট করার চেষ্টাকে সমর্থন করবেন না। নিজের অজান্তে তাতে নিজের ও নিজের স্বজনদের নিরাপত্তা নষ্ট করার রাস্তাই আপনি তৈরি করছেন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top