শিল্প ও সংস্কৃতি

অনুভূতি দ্বন্দ্বে বিদ্ধ ‘গন গার্ল’

গন গার্ল

[লিখার শেষ অংশে স্পয়লার আছে]

‘’We weren’t ourselves when we fall in love, and when we became ourselves – surprise! – we were poison. We complete each other in the nastiest, ugliest possible way.’’

পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীর সকালে নিক (বেন অ্যাফ্লেক) ঘরে ফিরে দেখে ঘরের দরজা খোলা, বসার রুমের কফি টেবিল ভেঙ্গে পড়ে আছে এবং তার স্ত্রী ঘরে নেই, কোথাও নেই। স্বাভাবিকভাবেই নিক ব্যাপারটি পুলিশকে জানায় এবং পুলিশ খুব শীঘ্রি বুঝে নেয় যে নিক তাদের সব খুলে বলছে না। বসার রুমের টেবিল যদি ওভাবে উল্টে পড়ে থাকে তবে কেন পাশেই তাকের উপরে রাখা ছবি-ফ্রেমগুলো নিচে পড়ে যায় নি – এ থেকে তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। এভাবেই নিক জুতসই উত্তরবিহীন প্রশ্নে প্রথমে পুলিশ এবং পরে মিডিয়ার সন্দেহে আসে। ঘটনাক্রমে অ্যামির (রোজামুন্ড পাইক) লিখে যাওয়া ডায়রী খুঁজে পায় পুলিশের এবং প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে অ্যামি খুন হয়েছেন? সন্দেহের তীর নিকের দিকে! সত্যিই কি সে অ্যামিকে খুন করেছে?

প্রত্যেকটা সম্পর্কের শুরু আমি তুমি আর আমাদের আবেগ সীমাবদ্ধসম্পর্ক নাম পাল্টায়, নাম হয় দায়িত্বব্যস্ততা পেয়ে বসে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ব্যস্ততায় ভুলে বসি খুব কাছের মানুষটার না বলা কথা, তার না বলা অনুভূতিতে আর আমি নেই। পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষই আলাদা, তাই তারা পছন্দঅপছন্দচিন্তাআদর্শেও ভিন্ন, এখানেই প্রয়োজন পড়ে বোঝাপড়ার। যদি তা না হয় তখনি সম্পর্কে থাকা মানুষগুলো শূন্যতায় ভোগে। ভাবুন, যাকে সবচাইতে বেশি পছন্দ করেন কতটা ঘৃণা জন্মালে তাকে সবচাইতে অপছন্দ করবেন? লেখক গিলিয়ান ফ্লিন ছবিতে এমন কতক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন,

I was told love should be unconditional. That’s the rule, everyone says so. But if love has no boundaries, no limits, no conditions, why should anyone try to do the right thing ever? If I know I am loved no matter what, where is the challenge?

সাইকোপ্যাথিকক্যারেক্টার চোখে ভাসলেই মনে পড়ে শ্যারন স্টোনেরবেসিক ইনস্টিংক্ট’ (১৯৯২)। সেই ছবিতে শ্যারন স্টোনকে যতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে পাওয়া যায়, গন গার্লে রোজামুন্ড পাইকের অভিনয়ে সেই প্রত্যয় খুঁজে পেতে অত বেগ পেতে হয় না। অভিনেত্রী হিসেবে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই সে হিসেবে রোজামুন্ডকে কাস্ট করাটা ফিঞ্চার নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।অ্যামিচরিত্রটির জন্য ফিঞ্চার এমন কাউকে চাইছিলেন যে কিনা তার মাবাবার একমাত্র সন্তান, যেন চরিত্রটি সে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এদিকে রোজামুন্ড ছিলেন এক অপেরা গায়িকার একমাত্র মেয়ে। ফিঞ্চার তার বেশ কটা কাজ দেখেছেন তবুও হচ্ছিল না, একদিন দুজন মিলে এক হোটেলে গেলেন ডিনার করতে, ঘন্টা চারেকের ডিনারটা শুরু হয়েছিল পানি দিয়ে, শেষটা হয় হুইস্কিতে! দীর্ঘ আলোচনার পর ফিঞ্চার নিশ্চিত হলেন যে তিনি তার অ্যামির খোঁজ পেয়েছেন। ফিঞ্চারের মতে, “দ্য রোল ইজ রিয়েলি ডিফিকাল্ট অ্যান্ড রোজামুন্ড ওয়াজ বর্ন টু প্লে ইট”।

যারা ছিলেন অভিনয়েঃ

ডেভিড ফিঞ্চারের ছবি হিসেবে ছবিটা আরও কত ভালো হতে পারতো সে প্রশ্ন থাকতেই পারে, তবেঅ্যামিচরিত্রে রোজামুন্ড পাইকের অভিনয় নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই, বরং সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। যে দৃশ্যেই পর্দায় এসেছেন অবাক করেছেন। এ ঘরানার ছবিতে চরিত্র বিবরণে চেহারা বা চাহনিতে যে অভিব্যক্তির প্রয়োজন পড়েঅ্যামিচরিত্রে তা পাওয়া যায়। বিশেষ করে অ্যামির ঘাড় বাঁকিয়ে হেঁয়ালি চোখে তাকানো দৃশ্যটির গ্রহণযোগ্যতা এতই তীক্ষ্ণ যে সহজেই এটিকে ছবির পোস্টারফ্রেম বলে চালিয়ে দেয়া যায়। পুরো ছবিই অ্যামিকেন্দ্রিক তবুও বেন অ্যাফ্লেকের করা ধীরস্থিরনিকচরিত্রে যথেষ্ট কাজের সুযোগ ছিল। নিজেকে শুরুতে নির্দোষ দাবি করা এবং শেষভাগে এসে সংশয় ফুটিয়ে তুলায় তিনি ভালো উতরেছেন।

গন গার্ল

অন্তরায় যে সব কারণঃ

ছবির কিছু দৃশ্য বর্ণনায় আরও বিশদে যাওয়া যেতো আবার কিছু ক্ষেত্রে পাওয়া যায় অযথা জটিলতা। বিশেষ করে অ্যামি যখন দেসি (নেইল প্যাট্রিক) ঘর থেকে পালিয়ে আসে সেই পুরো ব্যাপারটি আরও সহজে দেখানো যেতো, আবার পালিয়ে আসারকারণতদন্তে রয়েছে গাফলতি।

পরিচালকসংক্রান্তঃ

গন গার্ল

পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার

এলিয়েন থ্রি’ (১৯৯২) ছবি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা ডেভিড ফিঞ্চারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি অবশ্যইফাইট ক্লাব’ (১৯৯৯)। যদিও পরিচালক হিসেবে প্রথম অ্যাকাডেমি মনোনয়ন আসেদ্য কিউরিয়াস কেইস অফ বেঞ্জামিন বাটন’ (২০০৮) ছবির মাধ্যমে। সেই পথ ধরে ২য় অস্কার মনোনয়ন আসেদ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ (২০১০) ছবিতে, ভাগ্যে অস্কার হয়তো জুটে নি, তবে আকাঙ্ক্ষিত সম্মাননা জুটে বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোবে। ছবিটিকে সে বছর রজার ইবার্ট সহ অনেক সমালোচক উক্ত বছরের সেরা ছবি হিসেবে রায় দিয়েছেন। পরিচালনায় আসার আগে ফিঞ্চার কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রোডাকশন কোম্পানিতে, পরবর্তীতে মিউজিক ভিডিও ও বিজ্ঞাপনে দিয়েছেন নির্দেশনা। কিন্তু ছবি পরিচালনায় যখন আসলেন, শুরুর গল্পটা সেই একই মোড়কে মোড়া! প্রযোজকদের চাপে প্রথম ছবিটা নিজের মতো করে তৈরি করতে পারলেন না! ফলাফল হিসেবে আবার ফিরে যেতে হল মিউজিক ভিডিও ও বিজ্ঞাপনে। বছর তিন পর যখন আরেকটা সুযোগ আসলো এবার ছবি তৈরি হল পছন্দমতো। ধারাল নির্মাণশৈলীতেসেভেন’ (১৯৯৫) ছবিটির পরিণতিতে জুটলো সমালোচক ও দর্শক বন্দনা উভয়ই! সেই নির্মাণশৈলীতে তার ছবিতে প্রায় দাঁড়িয়ে গেল একটানিওনইরধারা যাতে পাওয়া যাবে অন্তর্দাহ, অদৃষ্টবাদ, এবং নৈতিক অস্পষ্টতা।

কেন দেখবেনঃ

ছবি হিসেবে গন গার্ল আরও একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার অবশ্যই নয়। ছবিতে একটি সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, সেই সম্পর্কের বন্ধনবিচ্ছেদের ফাঁকে ফাঁকে পর্যাপ্ত থ্রিল দিয়ে ছবিটি সাজানো। প্রধান চরিত্রে পাওয়া যাবে প্রয়োজনমাফিক অভিনয়। আর সময়ের সুদক্ষ পরিচালক ফিঞ্চারের আরেকটি ছবি দেখার সুযোগ কেন হারাতে চাইবেন?

আইএমডিবি লিংক

রটেন টমাটোজ রিভিউ

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top