নাগরিক কথা

যারা ফ্রিল্যান্সিং করতে চান তাদের জন্য কিছু কথা

ফ্রিল্যান্সিং

ফ্রিল্যান্সিং কিভাবে শুরু করা যায় এ নিয়ে অনেক বড়ভাইয়ের অনেক চমৎকার লেখা অনলাইনে আছে। খুজলেই পাবেন।

এই লেখাটা শুধুমাত্র নিজের ছোটখাট কিছু অভিজ্ঞতার উপর লেখা। তবে যারা নতুন ফ্রিল্যান্সার অথবা শুরু করবেন বলে ভাবছেন তাদের কাজে আসতে পারে।

কয়েক সপ্তাহ আগে ইমার্জেন্সী একটা গ্রাফিক্সের কাজ দরকার হওয়ায় রাতের বেলায় ওডেস্কে ছোট্ট একটা জব পোস্ট দেই। বাংলাদেশী কয়েকজনকে বিড করতে দেখে প্রথমজনকে মেসেজ পাঠাই কাজের ডিটেইলস দিয়ে। উত্তর আসে একটা ওয়ার্ড মাত্র। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বের করলাম যে এটা তার স্কাইপি আইডি। বিরক্তিসহ এড করলাম। কনভার্সেশনের প্রথম লাইনে সে প্রশ্ন করলো আমি কি করি? এভয়েড করে কাজের কথায় আসলাম। সে কনফিডেন্টলি বললো কাজটা তার হাতের ময়লা। করতে পারবে। তারপরই আবার প্রশ্ন আমি কই থাকি, কি করি, ফোন নাম্বারটা যাতে দেই, মাসে কত টাকা কামাই, ফেসবুক আইডি চায়। শুধুমাত্র বাংলাদেশী বলে টলারেট করে আবার কাজের কথায় আসলাম। তাকে ডক পাঠালাম কি করা লাগবে এটা দেখিয়ে। সে ১০ মিনিট পরে বললো পারবেনা, স্যরি। তারপর স্কাইপি থেকে রিমুভ করে দিলো। বিরক্ত হলাম ব্যাপক। পরের জনকে স্কাইপিতে আনার পরে দেখি সেও সেই ঘষা আলাপ শুরু করলো। তাকে অবশ্য এভয়েড করার পর আকামের কথাবার্তা বলেনাই।

– ফ্রিল্যান্সিং এর মার্কেটে নিজেকে পুরাদমে প্রফেশনাল ভাবুন। তেমনভাবেই বিহেইভ করুন যেমনটা কর্পোরেটরা করে থাকে। আপনার মূল টার্গেট আপনার স্কিলসেট অনুযায়ী কাজে বিড করে ক্লায়েন্ট পটিয়ে সুন্দরভাবে, টাইমলি কাজটা করে ডলারসহ পাঁচতারা রেটিং নেয়া। একই ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করতে করতে ভালো ফ্রেন্ডলী সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সুতরাং যখনি প্রথম কাজটা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখন “এক্ট ক্লিন”। সোজাসাপটা কথা বলুন। আপনার কথা যেন আপনার মুখের চাইতে আপনার প্রোফাইল, কাজের এক্সপেরিয়েন্সটা বেশী বলে।

ক্লায়েন্টকে শুধুমাত্র ক্লায়েন্টই ভাবুন এবং মাথায় রাখুন আপনাকে সে ফ্রিল্যান্সিং-এর কাজ দেবে। সুতরাং তার কথাবার্তার ফ্লো ধরে সেই ফ্লো অনুযায়ী কথা বলুন। তার সাথে খোশগল্প করতে যাবেন না। আপনার হাতে অগাধ সময় থাকতে পারে, সবার হাতে নেই। উপরন্তু ক্লায়েন্ট বিরক্ত হয়ে কাজ নাও দিতে পারে।

এই লেখাটা মূলত শুরু করেছি ওডেস্কে একটা জব পোস্ট দেখে আর এতে প্রথম ৩ জন আবেদনকারী দেখে। জব পোস্টটা বিগ ডাটা, হাডুপ এক্সপার্ট নিয়ে (কম্পিউটার সায়েন্সের বাইরের লোকদের বোঝার কথা না। বেশ এডভান্সড লেভেলের কাজ।) প্রথম ৩জন আবেদনকারীর প্রোফাইল, আগের কাজ দেখে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় এরা পারবেনা। আন্দাজী বিড করেছে। ৪র্থ জন বাংলাদেশের দেখেই আৎকে উঠলাম। উনিও প্রথম ৩জনের মতই ওয়েব ডিজাইন, ডেভলপমেন্টের কাজ করে থাকেন এবং এই পোস্টে বিড করছেন।

– ভুলেও এমন করবেন না। যে কাজের এটলিস্ট ৮০% বুঝেননাই সেটাতে বিড করার দরকার নাই। জব ডেসক্রিপশন খারাপ হলে অন্য ব্যাপার। মাথায় রাখবেন আপনি একজনের জন্য দেশের বাকীদের বদনাম হবে। অনলাইনে ইন্ডিয়ানরা খাচ্চড়টাইপ স্প্যামার হিসাবে পরিচিত। দয়া করে বাংলাদেশের রেপুটেশন এভাবে নামাবেন না। আপনি যেই কাজ পারবেন সেটাতেই বিড করুন। সেই পোস্টটার লিংক

– স্কিল বাড়ান নিজের। রেগুলার ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করুন। আজকে হয়তো আপনার টার্গেট ছোট-ছোট লোগো বানিয়ে দেয়া। বিনিময়ে ৩-৫ ডলার পাবেন। যদি ছবি ভালো আকতে পারেন তাহলে মোবাইল গেমের গ্রাফিক্স বানানোর দিকে নজর দিতে পারেন। বর্তমানে প্রচুর চাহিদা। ভালো আঁকতে পারলে চার পাচ হাজার টাকা দিয়ে একটা সিম্পল স্কেচপ্যাড কিনে কাজ শুরু করে দিতে পারেন ফ্রিল্যান্সিং-এর। তবে এর আগে শিউর হয়ে নিন পারবেন কিনা। না হলে শুধু শুধু টাকা নষ্ট করার মানে নাই। অথবা ওয়েবসাইট ডিজাইন, ক্রিয়েটিভ ডিজাইনের অনেক কাজ থাকে। নিজে আগে দুই একটা এক্সপেরিমেন্ট করেন, প্রোফাইলে এড করেন। ভালো হলে কাজ পাবেন। ফিলিপাইন্সের প্রচুর ছেলেমেয়ে মোবাইলের গেমের গ্রাফিক্সের চমৎকার কাজ করে। দেখলেই হিংসা লাগে।

দু’টা ঘটনা।

  • গত বছর রাত ২টার মত বাজে। মাত্র একটা কাজ পেলাম। খুশী মনে ঘুমাতে যাবো এমন সময় একটা জব পোস্ট দেখলাম Need a corona developer argent today। কি জানি মনে করে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি বাংলাদেশের ক্লায়েন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম ভেরীফাইড না, হিস্টোরী নাই কোন। মাথায় আসলো নিশ্চয়ই বিপদে পড়ে পোস্ট দিসে, পেমেন্ট দেয়ার জন্য কার্ড আছে কিনা কে জানে। ডেসক্রিপশন দেখে বুঝলাম ৫-১০ মিনিটের কাজ। মনে করলাম টেকাটুকা নিবো না। হেল্প করি। এত রাতে নিশ্চয়ই কোন ক্লায়েন্টের কাজ করতে বসে বিপদে পড়েছে। পারি যেহেতু, হেল্প করা যায়। মেসেজ দিলাম। স্কাইপিতে আসলো। নিজেই প্রচুর বগড় বগড় করলো। তার হাতে অনেক কাজ আছে, অনেক টাকা দেবে পরে যদিও আমি টাকার কথা/ হায়ার করার কথা উচ্চারণই করিনাই। জাস্ট বলসি কোডটা দিতে। কোড দিয়ে বললো আধাঘন্টার মধ্যে করে দিতে পারলে ৫০ ডলার বোনাস দেবে। আমি কোন রিপ্লাই না দিয়ে কোডটা ঠিক করে পাঠালাম এবং সে সুন্দর করে স্কাইপি থেকে ব্লক করে দিলো। ওডেস্ক আইডি ছিলো খুব সম্ভবত Shuvo Shuvo. পরে ফাইজলামী করে মেসেজ পাঠাইলাম যে সে টাকা দিবে নাকি। রিপ্লাই নাই!আমি টাকা চাই নাকি চাইনা সেটা আমার ব্যাপার। কিন্ত এপ্রোচের একটা ব্যাপার থাকে। এপ্রোচটা বাজে লাগসে। খুবই বাজে। এমনিতেও টাকার কথা বলিই নাই। আর সমবয়সী কারো থেকে ৫ মিনিটের কাজের জন্য টাকা নিতামই না।
  • কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়ান একটা ক্লায়েন্টের সাথে আলাপ হচ্ছে কাজ নিয়ে। সে দেখলাম ইন্ডিয়ান আর পাকিস্তানীদের উপর বিরক্ত। গালাগালি করে উজাড়। দুই দেশের দুইটাকে নাকি এডভান্স টাকা দিসিলো। কাজ না করে টাকা মেরে দিসে। আর্জেন্ট কাজ ছিলো।

সৎ থাকুন। এর প্রতিদান পাবেন। Honesty is the best policy. এটা ভুলবেন না। দেশীয় ছোটখাটো ধান্দাবাজি, ছ্যাচড়ামির অভ্যাস যদি থেকে থাকে এগুলি বাদ দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং-এ নামুন। ভালোভাবে নিজেও কাজ করতে পারবেন, বাংলাদেশের অন্যদেরও সুবিধা হবে। ছোট স্টেপ দিয়েই শুরু করুন না, আস্তে আস্তে বড় হবে। আপনি ঠিক যা ডিজার্ভ করেন, ঠিক তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। অন্যকে বোকা বানাতে যাবেন না। আপনি যখন একটা মাইলস্টোন পেমেন্ট নিয়ে কাজ কমপ্লিট না করে ভেগে যাবেন, তখন সেই ক্লায়েন্ট বাংলাদেশের আর কাউকে কাজ দেবেনা। হয়তো পোস্টেই লিখে দেবে, No Bangladeshi please. আপনি একা অনেক লোকের ভাত মেরে দিলেন। এগুলির প্রতিদান কোন না কোন ভাবে কিন্তু আপনাকেই ভোগ করতে হবে। ওয়ার্ক এথিক্স বজায় রাখুন।

কে গো তুমি নন্দিনী, আগে তো দেখিনি! সম্ভব হলে বিড করার আগে বা ইন্টারভিউ পর্বে ক্লায়েন্ট সম্পর্কে জেনে নিন। ক্লায়েন্টের নাম, ধাম গুগলে সার্চ দিন। ইন্ডিয়ান দেখলে বিড করারই দরকার নাই। বিরাট ধান্দাবাজ। কাজ করাবে, টাকা নিয়ে ঝামেলা করবে। লিংকডইনে প্রোফাইল পেলে সেটা দেখে ক্লায়েন্ট কি কি জানে, কি কি জানেনা সেটা বুঝুন। বেশী এক্সপেরিয়েন্সড হলে ন্যূনতম ফাপড়বাজিও বর্জনীয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ করতে পারবেন শিউর হলে সামান্য ফাপড়বাজী করা যেতে পারে কাজ বাগানোর জন্য। বুঝে করবেন যাই করেন।

– অ্যাক্ট স্মার্টলি। নিজে যা পারেন তা স্মার্টলি প্রেজেন্ট করুন বিড করার সময়। নেট ঘেটে সুন্দর একটা কভার লেটার বানিয়ে ফেলুন। যেটা পড়লে যে কেউ আপনার সম্পর্কে ক্লিয়ার ধারণা পাবে। বিভিন্ন পোস্টে বিড করার সময় এটাতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে পাঠিয়ে দিন। জব পোস্ট খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ুন। অনেক সময় ক্লায়েন্ট স্প্যাম ঠেকানোর জন্য বলে কোন একটা ওয়ার্ড দিয়ে কভার লেটার শুরু করতে। এগুলি খেয়াল করুন।

– আপনি যদি স্টুডেন্ট হন (বিশেষ করে ১ম থেকে ৩য় বর্ষ কম্পিউটার সায়েন্স) তাহলে আপনাকে আমি ডিসকারেজ করবো এখন ফ্রিল্যান্সিং করে সময় নষ্ট করার জন্য। স্টুডেন্ট লাইফ একটু টানাটানিতে না গেলে কিসের মজা। সিএসইতে অনেককিছু শেখার আছে। টাকার মায়ায় পরে গেলে যেগুলা আর শিখতে ইচ্ছা হবেনা। সুতরাং ভেবে চিন্তে।

সবশেষে, নিজের উপরে বিশ্বাস রাখুন। স্কিল বাড়ান। নতুন নতুন কাজ শিখুন। মজাও পাবেন সেইসাথে টেকাটুকারও কিছু চালান আসবে। তবে রেগুলার চেস্টা রাখবেন নতুন কিছু শিখার। এক কাজে টাকা চলে আসলে সেটা নিয়েই পড়ে থাকবেন না। অন্য কাজে আরো বেশী টাকাও পেতে পারেন।

শুভকামনা।

লেখকঃ সুদীপ্ত কর

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে বাংলাদেশের প্রথম সার্চ ইঞ্জিন “পিপীলিকা”-তে রিসার্চার ও ডেভেলপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ হিউস্টনে কম্পিউটার সায়েন্সের উপর পিএইচডি করছেন ও রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top