নিসর্গ

জলবায়ু পরিবর্তন : জাপানে ৭০০ বছরের পুরনো প্রমান

মধ্য জাপানের “কিনো পর্বতমালা”র উপর অবস্থিত “লেক সুয়া”। এ এলাকাকে অনেকেই জাপানি আল্পস বলে থাকেন। যখন শীতে লেক টি জমে যায়, প্রতিদিনের তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে বরফের সংকোচন এবং সারফেস পরিবর্তনের মাধ্যমে লেকের মাঝে একটি Ridge বা বরফ পাহাড়ের খাঁজ  তৈরী হয়। জাপানি গল্পকথা মতে, এই বরফ পাহাড়ের খাঁজের নাম “অমিওয়াতারি” যা শিন্টো দেবতাদের লেক পারাপারের সময় বরফের উপর দিয়ে হেটে যাওয়ার ফলে তৈরী। সেই তখন প্রায় ১৪৪৩  সাল থেকেই প্রত্যেক জাপানি ধর্মগুরু, যারা লেক সুয়ার তীরবর্তী মন্দিরে থেকেছেন তারা প্রত্যেক শীতে এই বরফ পাহাড়ের খাঁজ এর আবির্ভাবের সময় লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এই লিপিবদ্ধ ডাটা আমাদের বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা দেয়।

অন্যদিকে, ১৬৯৩ সালে এক ফিনিশ ব্যবসায়ি ওলফ আহবম (Olof Ahlbom) টরন নদী (Torne River) এর বসন্তকালীন বরফ ভাঙ্গার দিনক্ষণ লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন। এই বরফই সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডের মধ্যে কিছু সীমান্তবাধা তৈরী করে। ওলফ এর পরেও অন্যরা এই কাজ চালিয়ে যান।

যখনই বিজ্ঞানীরা আদি অতীতের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কিছু বলতে চান, তাদের প্রায় সবসময়ই নির্ভর করতে হয় কিছু অনিয়ন্ত্রিত ডাটার উপর। যেমন, গাছের গুড়ির রিঙের পরিবর্তন বা বরফের স্তর পরিবর্তন। কিন্তু জাপান এবং ফিনল্যান্ডীয় এই ডাটা আমাদের সরাসরি বলে দেয় আমাদের পূর্বপুরুষেরা কেমন জলবায়ু উপভোগ করে গেছেন।

২০১২ সালে লেক সুয়ার শেষ বরফপৃষ্ঠ

২০১২ সালে লেক সুয়ার শেষ বরফপৃষ্ঠ

১৯৯০ সালে, জন ম্যানুসন (John Magnuson, University of Wisconsin, Madison) নামক একজন ইকোলজিস্টকে প্রথম জাপানের এই বরফ ডাটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। জন তখন অন্য একদল বিজ্ঞানীর সাথে উত্তর গোলার্ধের বরফের ডাটা বিশ্লেষণ করছিলেন। সাম্প্রতিককালে জন,  Toronto York university এর ইকোলজিস্ট স্বপ্না শর্মা (Sapna Sharma) এর সাথে দলবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের জন্য এটি ছিলো ভীষণ বিশৃংখল কিছু ডাটা। এর অনেকাংশই জাপানি কথ্য ভাষায় রাইস পেপারের উপর লেখা। এছাড়াও তাদের লেক সুয়ার এলাকাগত ডাটা বিশ্লেষণ ও এমন একটি ক্যালেন্ডার ডিকোড করতে হয় যা শুধু পশ্চিমা ক্যালেন্ডার থেকেই ভিন্ন নয় এমনকি এক এক ধর্মগুরুর লিখিত ভাষায়ও ভিন্ন।

জন ও স্বপ্নার গবেষনার ফলাফল ২০১৬ সালের ২৬শে এপ্রিল “Nature Scientific Reports” এ প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে দেখা যায়, শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত বরফে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এমনকি প্রাচীন কালের কিছু “ভয়াবহ বিপর্যয়” এখন অনেকটাই সাধারণ। যেমন, প্রথম ২৫০ বছরে শিন্টো ধর্মগুরুর রেকর্ডে বরফ জমেনি এমন বছর গেছে তিনবার। ১৯৪৫ থেকে ২০০৪ সালে ১২টি বছর গেছে যখন বরফ জমেনি। আর ২০০৫ থেকে ২০১৪ সংখ্যাটি  ‘৫’।  জন এর রিপোর্ট অনুযায়ী  ২০১৫ শীতেও লেকে বরফ জমেনি।

অনেক বিজ্ঞানীই আমাদের ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলে চলেছেন। প্রখ্যাত দার্শনিক, পরিবেশবিদ ও ইতিহাসবিদ হেনরি ডেভিড থোরো (Henry David Thoreau) এর ১৮০০ সালের নোট আমাদের দেখায় কিছু ফুল এখন সময়ের অনেক আগেই প্রস্ফুটিত হয়, পরিবেশবিদ জোসেফ গ্রিনেলস (Joseph Grinnells) এর ১৯০০ সালের ক্যালিফোর্নিয়া ওয়াইল্ড লাইফ সার্ভে আমাদের বলে কিভাবে কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী নিজ এলাকা ছেড়ে আরো উত্তরে সরে গেছে। কিন্তু এই সব ডাটাই সাম্প্রতিক সময়ের, যেখানে জাপানি ৭০০ বছরের পুরোনো ডাটা আমাদের সেই গল্প শোনায়, কিভাবে মানুষ প্রকৃতিকে সময়ের সাথে পরিবর্তন করেছে।

জাপানি ৭০০ বছরের পুরোনো ডাটা আমাদের সেই গল্প শোনায়, কিভাবে মানুষ প্রকৃতিকে সময়ের সাথে পরিবর্তন করেছে।

আবার এই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে যাওয়া কাজ আমাদের শেখায় কিভাবে এবং কতটুকু মানুষের সহযোগিতার দরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধের জন্য। বিজ্ঞানীদের মতে, যদি এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বরফে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর মাত্রা বাড়তে থাকে তবে অচিরেই শিন্টো দেবতারা শেষবারের মত “লেক সুয়া” অতিক্রম করে ফেলবেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top