শিল্প ও সংস্কৃতি

হেভিমেটালের শিকড়

হেভিমেটাল

যদি শিরোনাম দেখে কারো ব্রাজিলের জনপ্রিয় হেভিমেটাল ব্যান্ড সেপালচুরা’র “রুটস ব্লাডি রুটস” গানটার কথা মনে পড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে হেভিমেটাল অনেক আগে থেকেই আপনাকে বশ করেছে। যদিও হেভিমেটাল আর মেটাল, এই দুই জনরা (Genre)/ ধরন আদতে একই, তবুও কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় এদের মধ্যে, এই বিষয়ে অবশ্যই পরে কথা হবে । আমরা এই লেখার মাধ্যমে হেভি মেটালের শিকড় খোঁজার চেষ্টা করব, যেটা কিনা দুনিয়ার সকল মেটালহেড অথবা হেডব্যাঙ্গারদের কাছে চরম আঁতলামির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলে রাখা ভালো, হেভিমেটালের অনুসারীরা যারা মেটালহেড নামে পরিচিত, তারা সঙ্গত কারনেই তারা কোন কালেই আঁতলামি পছন্দ করতো না ।

হেভিমেটাল

মেটালহেডস

হেভিমেটালের পেছনের ইতিহাস উত্থানের গল্প অনেকটা একই। যদি খুবই ছোট করে বলা যায় তাহলে বলতে হবে, ‘৬০ এর দশকের শেষ প্রান্তে এবং ‘৭০ এর দশকের প্রথমভাগে যখন আমেরিকা আর ইংল্যান্ড এ হেভিমেটালের জন্ম হল, তখন এই জনরা ততবেশি জনপ্রিয় না হলেও ‘৮০ এর দশকের প্রথম দিকে গ্ল্যামমেটালের রাজত্বে চিড় ধরিয়ে হেভিমেটালের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হয়েছিল।

পৃথিবীর বেশিরভাগ মেটালহেডই মনে করে গ্ল্যামমেটাল ছিল হেভিমেটালের সেই সাব-জনরা বা উপশাখা, যা কিনা মেটালের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছিল। কারনটা ছিল এমন, গ্লামমেটালের ফিচারগুলো এসেছিল পাঙ্ক রক এবং পপ মিউজিক থেকে, যাদের লিরিকের বিষয়বস্তু জুড়ে ছিল প্রেম, ভালবাসা। এই জন্যেই গ্ল্যামমেটালকে অনেকে পপ মেটাল বলে আখ্যা দিয়েছিল। আর অন্যদিকে হেভিমেটাল চিরকালই ছিল প্রতিবাদের ভাষা, সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কথা, কিন্তু সমগ্রই ছিল পুরুষত্বের প্রতাপশালিতা। এই জন্যই গ্ল্যামমেটাল ছিল হেডব্যাঙ্গারদের দুচোখের বিষ। কিন্তু মজার ব্যপার হল, অ্যারোস্মিথ, অ্যালিস কুপার, কিস, ভ্যান হ্যালেন, মোটলি ক্রু, পয়জন, গানস অ্যান্ড রোজেস, বন জোভি, স্কিড রো’এর মতো গ্ল্যামমেটাল ব্যান্ডগুলোকে অনেক কট্টোর মেটালহেডও এড়িয়ে যেতে পারেনি। এর পিছনের কারন অবশ্যই হল তাদের কালজয়ী গান এবং হেভিমেটাল ব্যান্ডগুলোর সাথে তাদের একসাথে লাইভ শো করা, একই মিউজিকাল ফিলসফি শেয়ার করা।

হেভিমেটাল

গ্লামমেটাল ব্যান্ড

আবার চলে আসা যাক আমাদের মূল অনুসন্ধানে। ‘৬০ এর দশকের শেষ ভাগটায় যখন সাইকাডেলিক রক এবং ব্লুজ ধারার স্বর্ণযুগ যাচ্ছিল, ঠিক তখন এই দুই ঘরানার সব চাইতে প্রগতিশীল মিউজিশিয়ানরা যারা মুলত এই দুই টাইপের মিউজিকের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিল হেভিমেটাল/মেটাল মিউজিকে, ঠিক তাদের চিন্তা চেতনার ফসল হল সবার প্রিয় হেভিমেটাল। একদিকে সাইকেডেলিক রক এর প্রথমকার দিকের বিখ্যাত নাম দ্যা বিটলস, দ্যা বিচ বয়েজ, দ্যা বার্ডস এবং অন্যদিকে ব্লুজ এর বিখ্যাত নাম মাডি ওয়াটার্স, জিম্মি রিড, আলবার্ট কিং এদেরকে আরও সামনে নিয়ে গেছে হেভিমেটালের শুরুর দিককার ব্যান্ডগুলো। যাদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় লেড জেপেলিন, ব্ল্যাক সাবাথ, ডিপ পার্পলের নাম এবং ‘৭০-এর মধ্যভাগ থেকে এদের সাহায্য করেছে জুডাস প্রিস্ট, মোটরহেড, আয়রন মেইডেন, স্যাক্সন, ডিও’র মত ব্যান্ডগুলো।

হেভিমেটাল

হেভিমেটালের প্রথম দিককার জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলো

এই ব্যান্ড গুলো হেভিমেটালকে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ডের তরুন,তরুণীরা এই ধরনের গানের চরম ভক্ত হয়ে যায়। তবে ‘৮০ দশকের মধ্যভাগে হেভিমেটালের নব জাগরণের যে কথা আগে বলা হয়েছিল, তাতে মূলত চারটি ব্যান্ড মূল ভূমিকা পালন করেছে যাদেরকে একসাথে “দ্যা বিগ ফোর” বলা হয়। এই বিগ ফোর হল মেটালিকা, মেগাডেথ, স্লেয়ার ও অ্যানথ্রাক্স। তাদের কথা আমরা পরে কখনো বিস্তারিত আলোচনা করব। এই বিগ ফোর বেসিক হেভিমেটাল থেকে একটু বের হয়ে আরো একটু ভিন্নভাবে মেটালকে উপস্থাপন করেছে যা মেটালহেডদের কাছে থ্র্যাশ মেটাল নামে পরিচিত। এই জনরাকে পরিপূর্ণ একটি রুপ দিয়েছে তারাই এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে এর জনপ্রিয়তা।

হেভিমেটাল

বিগ ফোর

এখন আমরা হেভিমেটালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলব, যেটা হল এই ধরনের গানের লিরিকের বিষয়বস্তু এবং গান গুলোতে বাবহারিত সাউন্ড এর বৈচিত্র্য।

প্রথমেই লিরিকের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব। অনেক মিউজিকাল স্কলারদের মতে হেভিমেটাল গানেড় কথাগুলো সবচাইতে সহজবোধ্য এবং সার্বজনীন, যা আসলে কিনা এই জনরাকে সবার আরও অনেক কাছে নিয়ে গিয়েছে । কিন্তু প্রথমদিককার ব্যান্ডগুলো অনেক ভারি বিষয়বস্তু আলকপাত করেছে, যেমন ব্ল্যাক সাবাথের গান গুলোতে তারা মানবিক বোধ নিয়ে কথা বলতো। মাঝে মধ্যে তারা আরও বিশদ ইস্যু নিয়ে কথা বলতো- যেমন রাজনীতি, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি। কিন্তু তৎকালীন সাড়াজাগানো সাইকেডেলিক ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের মতই তারা সাইকেডেলিক কালচার এর কথাও বলত, যা আমরা দেখতে পাই তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম থেকেই ।

হেভিমেটাল

ব্ল্যাক সাবাথ

এবং ধীরে ধীরে এই লিরিক গুলো আরও বেশি সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোকপাত করে, যা কিনা ৮০’র দশকের মাঝখানে আমেরিকান সরকারের মাথা ব্যাথার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এই ধরনের গান গুলোতে সমাজবাবস্থাকে, দেশ চালানোর নীতিকে ফলাও করে সমালচনা করা হত। এর দরুন জনপ্রিয় ব্যান্ড টুইস্টেড সিস্টারের এর ফ্রন্ট ম্যান ডি স্নাইডারকে তার গান “আন্ডার দ্যা  ব্লেড” নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট এবং আদালতের সামনে কারণ দর্শাতে পর্যন্ত হয়েছিলো। ১৯৮৬ তে ব্ল্যাক সাবাথ ব্যান্ডের গায়ক অজি অসবোর্নের নামে মামলা করা হয়েছিলো তার জনপ্রিয় গান “সুইসাইড সলিউশন” এর জন্য। মরক্কো, মিশর, লেবানন, মালয়শিয়ার মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশে হেভিমেটালকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সামাজিক মূল্যবোধ এর অবক্ষয় এর জন্য দায়ী দেখিয়ে।

হেভিমেটাল

আদালতে স্নাইডার

এইসব সমালোচিত এবং আলোচিত ঘটনাগুলো হেভি মেটালকে আরও বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ এর ভাষা এবং প্রচলিত অনাচার, দুর্নীতি এর বিরুদ্ধে কথা বলার ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সাম্প্রতিক হেভিমেটাল ব্যান্ড গুলো আরও কনসেপচুয়াল বিষয় নিয়ে কাজ করছে যেখানে আগের মূল বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাচ্ছে ।

এখন কথা বলব কেন এই হেভিমেটাল সবচাইতে আলাদা। মেটাল বা হেভি মেটাল কে সবচাইতে ডিফারেন্ট করেছে এর অনন্য সাউন্ড। হেভি মেটাল সম্পূর্ণই ‘ loud distorted guitars, emphatic rhythms, dense bass-and-drum sound, and vigorous vocals’ এর উপর নির্ভরশীল। ভারি গিটার রিফ, গ্রুভি বেজ লাইন, লাউড ড্রামস, ডাবল প্যাডেল উইথ ফাস্ট টেম্পো, চমৎকার ক্লাসিকাল নির্ভর ফাস্ট গিটার সোলোস, উচ্চস্বরের গলা ফাটানোই আসলে হেভিমেটালকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আদর্শ করেছে।

হেভিমেটাল

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে টেকনিকাল ডেথ মেটাল ব্যান্ড গজিরা‘র কনসার্ট

এটা বলতেই হবে যে ব্লুজ এবং আরএনবি এর সাথে মেটালের গিটার প্যাটার্নে সাদৃশ্য থাকলেও ক্লাসিকাল মিউজিকের সাথে এর যোগসাজশ আগে থেকেই ছিল। যা আমরা দেখতে পাই হেভিমেটালের পাইয়োনিয়ার গিটারিস্টদের ক্লাসিকাল মিউজিকের প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ থেকেই। আর গিটার রিফের কথা বলতে গেলে তিনটি হারমনিক প্যাটার্ন এর কথা বলতে হয় সেগুলো হল, মোডাল স্কেল প্রোগ্রেশন, ট্রাইটোন ও ক্রোমাটিক প্রোগ্রেশন এবং পাওয়ার কর্ডের উপযুক্ত ব্যবহার। এই গুলোর উপর ভিত্তি করে হেভিমেটালের গিটার রিফগুলো কম্পোজ করা হত। এখন এর বাতিক্রম অনেক কিছু দেখা যায় ।

হেভিমেটাল

ড্রামস আর বেজ এর কথা বলতে গেলে ফাস্ট টেম্পো, ব্লাস্ট বিটের সাথে কোয়ান্টাইজ এবং ইনোভেটিভ বেজ প্লেয়িং মেটালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিচার। ভোকালের ধরনে মেটাল এর সাব-জনরা গুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। প্রথম দিকে হাই পিচ ভোকালের সাথে পরে আমরা আরও দেখতে পাই থ্রাশ, গ্রান্ট, গ্রাঞ্জ, গ্রাউল, স্ক্রিম ছাড়াও আরও অনেক ভিন্ন রকমের ভোকাল প্যাটার্ন।

হেভি মেটাল পৃথিবীকে শাসন করার পিছনে এর সাবজনরা গুলোও জড়িত। ডেথ মেটাল, সিম্ফনিক মেটাল, ডুম মেটাল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেটাল, নু মেটাল, টেকনিকাল ডেথ মেটাল, স্পিড মেটাল, নিউ ওয়েভ ব্রিটিশ হেভি মেটাল, অল্টারনেটিভ মেটাল, ক্রিচিয়ান মেটাল, গ্রুভ মেটাল, প্রগ্রেসিভ মেটাল থেকে শুরু করে হালের জনপ্রিয় জেন্ট (Djent) এর লিরিকের ধরন এবং বাজানো ভিন্ন হলেও তারা সবাই হেভিমেটালকে আরও শক্তিশালি করেছে ।

হেভিমেটাল-১

মেটালের হিস্ট্রি এবং সাব জনরা

হেভিমেটাল/মেটালের পিছনের অনবদ্য ইতিহাস আরও অনেক সুবিশাল এবং এক লেখায় শেষ করা অসম্ভব । পরের কিস্তিতে হয়তো আমরা অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা করব।

আর লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনেকে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, তবে মেটালহেড ব্রাদারহুডের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এর পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলা কাম্য। (চলবে)

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: ক্রিপটিক ফেইট দানব, নাকি শ্রেষ্ঠ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top