বিশেষ

বুক রিভিউঃ প্রবাদের উৎস সন্ধানে ‘প্রবাদের উৎসসন্ধান’।

প্রবাদের উৎসসন্ধান

কয়েকদিন আগে একখানা বই হাতে পেলাম। বইয়ের নাম ‘প্রবাদের উৎসসন্ধান’, লেখকের নাম সমর পাল। উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ওপর উনার উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। ভারি ভারি বিষয়ের লেখকদেরকে আমার মত লঘু পাঠকেরা বরাবরই ভীতির চোখে দেখে। তবুও সূচিপত্রে ‘অকালকুষ্মাণ্ড’, ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’, ‘আষাঢ়ে গল্প’, ‘কাকতালীয় ব্যাপার’, ‘খয়ের খাঁ’, ‘জগা খিচুড়ি’, ‘অগস্ত্যযাত্রা’, ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট’, ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’, ‘কড়ায় গণ্ডায়’, ‘সস্তার তিন অবস্থা’, ‘রাবণের চিতা’ ইত্যাদি অতি পরিচিত প্রবাদের নাম দেখে আগ্রহী হলাম। এসব প্রবাদ কোত্থেকে এল?- এই প্রশ্নটি মনের ভেতর ঘুরপাক খায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ভারি লেখকের জ্ঞানের ভার বইয়ের ভূমিকার প্রথম পৃষ্ঠা পড়েই অনুভব করলাম এবং পুরনো আতঙ্ক জেগে উঠলো। ভূমিকা শেষ করে মনে হল লেখক মহোদয় সম্ভবত সেই গোত্রীয়, যারা কাঠিন্যের মুখোশে আলাপ শুরু করে আর এগোনোর সাথে সাথে আলাপের রস বের হয়ে আসে ধীরে ধীরে।

মূল লেখা শুরু হয়েছে ‘অকাল কুষ্মাণ্ড’ প্রবাদের উৎস খোঁজার চেষ্টায়। বাংলা বর্ণের ক্রম অনুযায়ী প্রবাদগুলো এসেছে। ‘অ’ শেষ করে ‘আ’, এভাবে ‘হ’ তে হরিহর আত্মা পর্যন্ত সর্বমোট ১১০টি প্রবাদ।

প্রবাদ, প্রবচন, ও বাগধারার ভেতর টেকনিক্যাল পার্থক্য রয়েছে। বাগধারা হলো বাক্যে ব্যবহৃত এক বা একাধিক শব্দ, যা বিশেষ অর্থপ্রকাশ করে। যেমন: এই প্রবন্ধের লেখক একটা আমড়া কাঁঠের ঢেঁকি। এখানে ‘আমড়া কাঁঠের ঢেঁকি’ শব্দগুচ্ছ বিশেষ অর্থপ্রকাশ করেছে যার মানে হচ্ছে অকর্মণ্য। তাই এটি একটি বাগধারা। প্রবাদ ও প্রবচন উভয়েই পূর্ণাঙ্গ বাক্য, বাক্যের অংশবিশেষ নয়। উভয়েই দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থাৎ প্রবাদ বা প্রবচনের একটা ঐতিহ্য আছে। কিন্তু উভয়ের ব্যবহারিক অর্থে পার্থক্য রয়েছে। প্রবাদের একটা নিগূঢ় অর্থ থাকে। কিন্তু প্রবচনে যা বলা হচ্ছে তা সরাসরি, পেছনে কোনকিছু লুকিয়ে নেই। ‘ঊন বর্ষায় দুনো শীত’- এটি একটি প্রবচন। সরাসরি বলে দেয়া হয়েছে কোন বছরে বর্ষা কম হলে শীত বেশি পড়বে। কিন্তু ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’- একটি প্রবাদ। কারণ এখানে নিগুঢ় অর্থ আছে, সেটি হল অন্যায়কারীদের ভেতর আঁতাত থাকে। এখানে দুই ‘চোর’ সমস্ত দুই নম্বুরি লোকের প্রতিনিধি আর ‘মাসতুতো ভাই’ সম্পর্কটি সকল প্রকার খাতিরের সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করছে।

লেখক ভূমিকাতেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রবাদ, প্রবচন, ও বাগধারার পার্থক্য চিহ্নিত করার ইচ্ছে তার নেই। ‘প্রবাদ’ নামেই সবকিছুকে তিনি বইয়ে উপস্থাপন করেছেন। তার মূল উদ্দেশ্য পাঠককে এসবের উৎস সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়া এবং আরো বিস্তর গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা।

‘অকাল কুষ্মাণ্ডে’ গান্ধারীর একশো পুত্র ও এক কন্যা প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে দেখে বুঝলাম পেশাদারি লেখকের মত হিসেব কষে ঠিক মূল বিষয় ধরে লেখার চেষ্টা তিনি করেননি। তিনি তার জানাশোনার ডালপালা মেলে ধরেছেন, পাঠক তা থেকে তার প্রয়োজনীয় অংশটুকু নিয়ে নেবে। বোনাস অংশটুকু ইচ্ছে অনুযায়ী কেউ নেবে বা নেবে না।

পৃষ্ঠা এগোনোর সাথে সাথে লেখা সাবলীল হয়েছে। বইয়ে উল্লিখিত প্রবাদের অধিকাংশের উৎস ভারতীয় পুরাণ। অকাল কুষ্মাণ্ড, অতি দানে বলির পাতালে হল ঠাঁই, অশ্বত্থামা হত ইতি গজ, কংসমামা, কুম্ভকর্ণের ঘুম, অগস্ত্যযাত্রা, অতি দর্পে হত লঙ্কা, ধুন্ধুমার কাণ্ড ইত্যাদি অন্তত অর্ধেক প্রবাদ এসেছে এই উৎস থেকে। ফলে ভারতীয় পুরাণ সম্পর্কে অজ্ঞাত বা অল্পজ্ঞাত পাঠক অনায়াসেই প্রাথমিক একটা ধারণা পেয়ে যাবেন। ভারতীয় পুরাণের অফুরন্ত ভাণ্ডারে প্রবেশের উৎসাহদাতা হিসেবে এই বইটি কাজ করতে পারে।

বই থেকে একটা প্রবাদের উৎস তুলে দিই। প্রবাদটি হল ‘মারের ওপর ওষুধ নাই’:
“এক ব্রাহ্মণের চার মেয়েজামাই- হরি, মাধব, পুণ্ডরীকাক্ষ ও ধনঞ্জয়। শ্বশুরের বাড়িতে মহাসুখে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছে তারা। বিনা পরিশ্রমে আদর-যত্নে তাদের দিন কেটে যাচ্ছে। কিন্তু শ্যালকেরা ভগ্নিপতিদের অত্যাচার আর সহ্য করতে পারছে না। নানা কৌশলেও বাড়িছাড়া করা যাচ্ছে না জামাইদের। ফন্দি আঁটতে থাকে শ্যালকেরা।

একদিন খাবার সময় জামাইরা দেখলো যে তাদের পাতে ঘি পড়েনি। বড় জামাই হরি এতে অপমানিত বোধ করলেও অন্যরা তেমন কিছু মনে করলো না। হরি অসন্তুষ্ট হয়ে শ্বশুরবাড়ি ছাড়লো। থাকলো অন্য তিন জামাই। আরেকদিন খাবার আসন বা পিঁড়ি দেয়া হলো না জামাইদের। এতে অপমানিত হয়ে চলে গেল দ্বিতীয় জামাই মাধব। আরেকদিন খাদ্যসামগ্রী ছিল নিকৃষ্টমানের। মনের দু:খে তৃতীয় জামাই পুণ্ডরীকাক্ষ ত্যাগ করলো শ্বশুরালয়।

কিন্তু চতুর্থ জামাই ধনঞ্জয় আর যায় না। যত অপমানজনক ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন কোনটিই তাকে টলাতে পারে না। মহাসঙ্কটে পড়ে শ্যালকেরা তাকে একদিন লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দিল। প্রবাদটি সংক্ষেপে প্রহারেণ ধনঞ্জয়: বলা হয়, অর্থাৎ মারের দ্বারাই ধনঞ্জয় শ্বশুরবাড়ি ছাড়ে।”

তথ্যের চাপ যারা নিতে আগ্রহী নন, তারা অনয়াসে সেসবকে এড়িয়ে গিয়ে এরকম সাবলীল ভাষাতেই প্রবাদের ইতিহাস জেনে নিতে পারবেন। মোট কথা, শৈশব থেকে ব্যাকরণ বইয়ে কিংবদন্তিতুল্য যেসব প্রবাদ আমরা পড়ে এসেছি, মাথা চুলকিয়েছি এই অদ্ভুত জিনিসগুলো কোত্থেকে এল ভেবে, তার বেশকিছুর উত্তর পাওয়া যাবে এই বইয়ে। লেখক যে উদ্দেশ্যে বইটি লিখেছেন সেই উদ্দেশ্য কতখানি সার্থক হয়েছে তা বিচার করতে গেলে একজন মাঝারিমানের পাঠক হিসেবে আমি ১০ এ ৭.৫ দেব। আপনার মার্কিং আপনি করে ফেলুন, দেখুন আমার সাথে মেলে কিনা।

সহায়ক তথ্যসূত্র:
– সমর পাল। ‘প্রবাদের উৎসসন্ধান’।
এডুকেশনপিডিয়া বাংলাদেশ
শুদ্ধ বানান চর্চা

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top