টাকা-কড়ি

৩০মিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে দিলো ১৪ বছর বয়সী সিইও

responsive photography portfolio html template

১৪ বছর বয়সে আপনি-আমি যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, গল্পের বই পড়ে আর খেলাধুলা করে আমাদের কৈশোর কাটিয়েছি, যদি কেউ বলে ঠিক সেই বয়সেই একজন কিশোর একটি পুরোদস্তুর স্টার্টআপ কোম্পানির সিইও হয়ে গিয়েছে আর দশটি কিশোরের মতই পড়াশোনা, খেলাধুলা করে আর বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে- তাহলে কি আপনি তার কথা বিশ্বাস করবেন?

সম্পূর্ণ বিষয়টি আরো অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে, যখন আপনি শুনবেন এই ছোট্ট ছেলেটিই অতি সম্প্রতি অবলীলায় ৩০মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি পায়ে ঠেলে দিয়েছে!

কথা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের অপেলিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র টেইলর রোজেনথালের বিষয়ে, যে কিনা গত বছর থেকেই “রেকমেড” নামক একটি উঠতি এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসায়ের প্রাথমিক উদ্যোক্তা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্প্রতি তাকে নিয়ে বেশ শোরগোল পরে গেছে সেদেশের ছোট-বড় সব সংবাদমাধ্যমে, এমনকি অনেকে তাকে সম্বোধন করছেন “আগামীদিনের বিল গেটস” বলেও।

স্কুল বেসবল দলের প্রথম বেজম্যান, পিচার এবং ক্লাসের সব বিষয়ে এ-গ্রেড পাওয়া রোজেনথালের রেকমেড শুরু করার চিন্তাটি তার প্রিয় খেলা বেসবল এবং একটি স্কুল প্রজেক্টের সম্মিলন। ছোটবেলা থেকেই খেলাপাগল এই ছেলেটি গতবছর তার স্কুলের তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার একটি কোর্সে অংশ নেয়। সেখানে ব্যবসায়-উপযোগী আইডিয়া নিয়ে চিন্তাভাবনা করার এক ফাঁকেই তার হঠাৎ মনে পরে নিয়মিতই খেলাধুলার সময় কম-বেশি চোট পাওয়া ছেলেদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কি ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভাবামাত্রই সে বিভিন্ন খেলাধুলার ফাঁকে খেলোয়াড়দের প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি নিয়ে ছোট পরিসরে ব্যবসা করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে ১৪ বছর বয়সী সিইও টেইলরের বক্তব্য- “আলাবামার বিভিন্ন জায়গায় স্কুলের হয়ে বেসবল খেলতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম ছেলেরা নিয়মিতই খেলার মধ্যে ব্যাথা পাচ্ছে এবং তাদের বাবা-মারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে ছেলের জন্য ব্যান্ড-এইড খুঁজতে। আমি এই সমস্যাটা দূর করতে চাচ্ছিলাম”।

 

বর্তমানে রেকমেড বিভিন্ন প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি দুইটি ভিন্ন প্যাকেজে একটি স্বয়ংক্রিয় ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে বিক্রয় করে।

১৪ বছর বয়সী সিইও টেলর রোজেনথাল

টেইলরের ভেন্ডিং মেশিনে যা যা পাওয়া যাবে

তবে শুরুর দিকে বিষয়টি এরকম ছিল না। টেইলর রোজেনথালের প্রথম দিককার ভাবনা ছিল খেলার ভেন্যুর পাশেই একটি ছোট স্টলে চুক্তিভিত্তিতে একজন দোকানী ভাড়া করে তার মাধ্যমে বিক্রি-বাট্টা চালানোর। কিন্তু খেলা চলাকালীন অল্প সময়ে ভাড়া করা লোক রেখে দোকান চালিয়ে আসলে লাভ তুলে আনা সম্ভব না। এ পর্যায়ে টেইলর বিকল্প চিন্তা হিসেবে ভেন্ডিং মেশিন ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। এতে বিনিয়োগকালীন প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা বেশ লাভজনক হয়ে উঠে। এই পরিকল্পনাটি টেইলর তার বাবা-মার সাথে আলোচনা করে, যারা দুইজনই মেডিকাল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। তাদের পরামর্শেই টেইলর তার ভেন্ডিং মেশিন এবং ব্যবসার একটি মডেল দাঁড়া করিয়ে ফেলে এবং ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এর পেটেন্টও পেয়ে যায়।

১৪ বছর বয়সী সিইও টেলর রোজেনথাল

নিজের পেটেন্টকৃত ভেন্ডিং মেশিনের সাথে টেইলর রোজেনথাল

টেইলর রোজেনথালের ইচ্ছা আর কয়মাসের মধ্যেই রেকমেডের ভেন্ডিং মেশিনগুলো মাঠে নামানোর। এমিউজমেন্ট পার্ক, স্কুল, বাচ্চাদের খেলার মাঠসহ যেসব জায়গায় শিশু-কিশোরদের ছুটোছুটি করার প্রবণতা বেশি, সেসব স্পটে কম্পিউটারাইজড ভেন্ডিং মেশিনগুলো স্থাপন করার ইচ্ছা আছে টেইলর। সৌভাগ্যবশত, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ এমিউজমেন্ট পার্ক প্রতিষ্ঠান “সিক্স ফ্ল্যাগস” এর কাছে ইতোমধ্যেই ১০০টি ভেন্ডিং মেশিন সরবরাহ করার চুক্তি করেছে টেইলর রোজেনথাল, যার প্রতিটির মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ৫,৫০০ ডলার করে। এই চুক্তি বাবদ ৫,৫০,০০০ আয় করা ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাক্তিগত বিনিয়োগকারীর (এঞ্জেল ইনভেস্টরস) এ পর্যন্ত রেকমেডে বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ ১,০০,০০০ ডলার।

 

টেইলরের এ সাফল্য যে শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমগুলরই নজর কেড়েছে, তা না। ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এক বড়মাপের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তার এই পেটেন্ট ৩০ মিলিয়ন ডলারর বিনিময়ে কিনে নেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে বলে জানায় এই কিশোর উদ্যোক্তা। তবে ভেস্তে যাওয়া এই চুক্তির অপর পক্ষে কারা ছিল তা প্রকাশ করতে অপারগতা জানায় সে।

 

এই মুহুর্তে টেইলর রোজেনথাল “রাউন্ড হাউজ” নামক একটি স্টার্টআপ ইনকিউবেটরের সাথে কাজ করছে। রাউন্ড হাউজের প্রতিষ্ঠাতা কাইল স্যান্ডলার জানান, “ছেলেটাকে সাফল্যের নেশায় পেয়ে বসেছে। স্কুলের সময় বাদে প্রতিটি মুহুর্ত এখন সে এখানে কাটায় তার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করে। সে এতটাই একাগ্রতার সাথে কাজ করছে যে গত বছর ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় তাকে আমরা জোর করে এখান থেকে বের করে বাসায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলাম।”

 

যে স্কুল প্রজেক্টের ফসল এই চমৎকার উদ্যোগ, তাতে টেইলরের শিক্ষক ছিলেন ক্ল্যারিন্ডা জোনস। ছাত্রের সাফল্যে গর্বিত ক্ল্যারিন্ডা বলেন, “গত এক বছরে টেইলরের এই সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ নিজের চোখে দেখা ছিল খুবই সুন্দর একটি অভিজ্ঞতা।

১৪ বছর বয়সী সিইও টেলর রোজেনথাল

সফল ছাত্র টেইলর ও তার গর্বিত শিক্ষক ক্ল্যারিন্ডা

হঠাৎ পেয়ে বসা এই সাফল্যের পরেও সে এখনো বেশ নম্র, বিনয়ী এবং সবসময় অন্যদের সাহায্য করতে উৎসুক। বিল গেটসও তার এই সাফল্যেকে সমীহ করতে পারে।”
টেইলর রোজেনথালের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগের অভাবনীয় উন্নতিকে বর্তমান অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ভাবনী প্রতিভা এবং সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণের মাহ্যমে যেকোন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই যে বড় একটি প্রতিষ্ঠানের বীজ বপন করতে পারেন, টেইলর ও তার প্রতিষ্ঠান রেকমেডকে তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ সিএনএন মানি

Most Popular

To Top